logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৯
পিপলস লিজিং অবসায়ন
কর্মী-আমানতকারীদের চোখেমুখে অন্ধকার
মৌসুমী ইসলাম

‘দেশের আর্থিক খাতের যা অবস্থা, তাতে কোথায় গেলে চাকরি মিলবে? সংসার চালাব কীভাবে? আমাদের জমানো টাকাও এ প্রতিষ্ঠানে রেখেছি। সেই টাকাই বা কবে পাব? এমন হাজারও প্রশ্ন নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছেন রোকেয়া বেগম। বন্ধ হয়ে যাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের এ কর্মী বলেন, হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে কল্পনাতেও ছিল না। এখন কোথায় গেলে মিলবে চাকরি আর কবে জমানো টাকা পাওয়া যাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বৃহস্পতিবার পিপলস লিজিংয়ের মতিঝিল কার্যালয়ে ছিল ভিন্ন দৃশ্যপট। কর্মচঞ্চল অফিসে বিদায়ের সুর। এক সপ্তাহ আগেও ব্যস্ত সময় পার করতেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু এখন পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। গেল বুধবার আসে দুঃসংবাদ। মালিক পক্ষের অনিয়ম আর লুটপাটে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের সিদ্ধান্ত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ খবরে ভেঙে পড়েন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। সবার চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা। সবাই উদ্বিগ্ন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। গণমাধ্যমের খবর জেনে সকাল থেকেই প্রধান কার্যালয়ে ভিড় করেন আমানতকারীরা। নিজের জমানো টাকা কীভাবে ফেরত পাবেনÑ মিলছে না তার সদুত্তর।
প্রতিষ্ঠানের একজন নারী কর্মী জানান, এখন চাকরি পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। এমন অবস্থায় আমরা কোথায় যাব। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে বলা হয়, একেকটি পর্ষদ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ ঘটেনি। কর্মীরা জানান, নিরাপত্তার জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুয়েটি সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি চাকরি নিশ্চিত করারও দাবি তোলা হয়। আর একজন কর্মী জানান, প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জমানো অর্থও বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই টাকার কী হবে। দুই দিকে সমস্যাÑ একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে আমাদের জমানো টাকার কী হবে, তা জানা যাচ্ছে না। 
আমানতকারীরা বলেন, জমানো টাকার জন্য দীর্ঘদিন ঘুরেও পাওয়া যাচ্ছে না। বলা হয়, আজ দেওয়া হবে, অথবা কাল। কিন্তু টাকা আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের চাওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এর একটি সুষ্ঠু সুরাহা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকাই খেলাপি, যার বেশিরভাগই নামে-বেনামে বের করে নিয়েছে মালিক পক্ষ।
পিপলস লিজিংয়ে জমানো টাকা ফেরত নিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে এভাবেই ভিড় করছেন আমানতকারীরা। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের সিদ্ধান্ত হলেও টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। সব দিক পর্যালোচনার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ দেওয়া হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরুর ২২ বছরের মাথায় অবসায়নে গেল পিপলস লিজিং। দীর্ঘদিন বন্ধ পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ওয়েবসাইট। ২০১৪ সালের পর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠান কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। দেশে প্রথম কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও আমানতকারীদের অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। তবে, আদালত কৌশল নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা কারও কাছে নেই। অনিয়মে জড়িয়ে যারা এ প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তাদের কীভাবে শাস্তির আওতায় আনা হবে, তাও নিরূপণ হয়নি। যারা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তাদের কাছ থেকে অর্থ এনে আমানতকারীদের দেওয়া হবে কি নাÑ তাও জানা যাচ্ছে না। 
অনিয়মের জন্য আগের পরিচালনা পর্ষদকে দায়ী করেছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সামি হুদা। বলেন, আগের পর্ষদের অনিয়মের দায় কাটিয়ে উঠতে পারেনি পিপলস লিজিং। তিন বছর বন্ধ ঋণ কার্যক্রম। তিনি বলেন, সব আমানতকারী যেন টাকা পায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, কষ্টার্জিত অর্থের একটি সুরাহা প্রয়োজন। দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের অনেকেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে এবং পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এরপরও প্রতিষ্ঠানটির কোনো উন্নতি হয়নি। ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে দূরাবস্থা, আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারাÑ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ (৩) এবং ২৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। সম্মতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ২৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয়। চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]