আজ ফিনল্যান্ডে বছরের দীর্ঘতম দিন: মধ্যরাতেও হাসে সূর্য

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১৫:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

  জামান সরকার, হেলসিঙ্কি থেকে

পৃথিবীর অনেক দেশেই গ্রীষ্ম আসে, সূর্য উজ্জ্বল হয়, দিন বড় হয়। কিন্তু ফিনল্যান্ডে গ্রীষ্মের এক বিশেষ মুহূর্ত আছে, যা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। জুনের শেষভাগে এসে এই উত্তর ইউরোপের দেশটি উপভোগ করে বছরের দীর্ঘতম দিন ও ক্ষুদ্রতম রাত। এ সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে এমনকি সূর্য একেবারেই অস্ত যায় না। রাত ১২টায়ও আকাশে দিনের আলো বিরাজ করে।

২০২৬ সালে ফিনল্যান্ডে জুহান্নুস বা মিডসামার ডে পালিত হচ্ছে ২০ জুন। এর ঠিক পরদিন, ২১ জুন, ঘটে গ্রীষ্মকালীন অয়ন বা সামার সলস্টিস (Summer Solstice), যা উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্ত হিসেবে পরিচিত।

যখন রাত হারিয়ে যায়

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে (Helsinki) জুন মাসে সূর্যাস্ত হয় প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি এবং ভোরের আগেই আবার সূর্য উঠে যায়। ফলে প্রকৃত অন্ধকার বলতে কিছুই থাকে না। আকাশে সারারাত নীলাভ-সোনালি আলো ছড়িয়ে থাকে, যাকে ফিনিশরা বলে ‘হোয়াইট নাইট’ (White Night) বা সাদা রাত।

আর দেশের উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল ল্যাপল্যান্ডে (Lapland) পরিস্থিতি আরও বিস্ময়কর। সেখানে টানা কয়েক সপ্তাহ সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। মধ্যরাতেও সূর্যের আলোয় পাহাড়, বনভূমি ও হ্রদ ঝলমল করে।

কেন হয় এই ঘটনা

পৃথিবী তার অক্ষের ওপর প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। জুন মাসে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে সূর্যের আলো দীর্ঘ সময় ধরে উত্তরাঞ্চলে পড়ে এবং দিন সবচেয়ে বড় হয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় সামার সলস্টিস বা গ্রীষ্মকালীন অয়ন।

এই দিন থেকেই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রীষ্মের সূচনা ধরা হয়। যদিও এর পরের দিনগুলোতে দিন ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করে, তবুও গ্রীষ্মের আবহ থাকে আরও কয়েক মাস।

পুরো দেশ যেন উৎসবের দেশে পরিণত হয়

ফিনল্যান্ডে বছরের দীর্ঘতম দিন কেবল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি জাতীয় অনুভূতিরও অংশ। জুহান্নুস বা মিডসামার উৎসবকে কেন্দ্র করে শহর থেকে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামাঞ্চল, দ্বীপপুঞ্জ ও গ্রীষ্মকালীন কটেজে। পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়দের নিয়ে তারা প্রকৃতির মাঝে উদযাপন করে এই আলোর উৎসব।

হ্রদের তীরে জ্বলে ওঠে বিশাল অগ্নিকুণ্ড বা ‘কোক্কো’। গরম হয় সাউনা, শুরু হয় গান, নাচ, বারবিকিউ ও নৌবিহার। অনেকেই মধ্যরাতে হ্রদে সাঁতার কাটেন, কারণ তখনও চারপাশে দিনের আলো থাকে।

পর্যটকদের জন্য এক স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা

বিশ্বের নানা দেশ থেকে পর্যটকেরা এই সময় ফিনল্যান্ডে আসেন শুধুমাত্র ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্য দেখার জন্য। বিশেষ করে ল্যাপল্যান্ডে রাত ১২টায় সূর্যকে আকাশে দেখা অনেকের কাছে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী এবং ভ্রমণকারীদের জন্য এটি এক অনন্য সময়। রাতের আকাশে সূর্যের সোনালি আলো, শান্ত হ্রদের পানিতে তার প্রতিফলন এবং নিস্তব্ধ বনভূমির সৌন্দর্য মিলে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব পরিবেশ।

বাংলাদেশের জন্য বিস্ময়ের গল্প

বাংলাদেশে যেখানে জুন মাস মানেই বর্ষার মেঘ, বৃষ্টি আর স্বাভাবিক দিন-রাতের পালাবদল, সেখানে ফিনল্যান্ডের দীর্ঘতম দিন যেন প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপকথা। এখানে রাত নামলেও অন্ধকার নামে না। শিশুরা গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে খেলতে পারে, মানুষ মধ্যরাতেও হাঁটতে বের হয়, আর প্রকৃতি যেন ২৪ ঘণ্টাই জেগে থাকে।

ফিনল্যান্ডের মানুষের কাছে এই সময়টি শুধু ঋতু পরিবর্তনের নয়, বরং জীবনকে উদযাপনের সময়। দীর্ঘ ও অন্ধকার শীতের পর সূর্যের এই অফুরন্ত উপস্থিতি তাদের মনে নিয়ে আসে নতুন উদ্দীপনা, আনন্দ ও আশার বার্তা।

শেষ কথা

বিশ্বের সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ডের সুখের পেছনে প্রকৃতিরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বছরের দীর্ঘতম দিন সেই প্রকৃতিরই এক অসাধারণ উপহার। যখন মধ্যরাতে সূর্য হাসে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন মানুষের জন্য বিশেষ এক উৎসবের আয়োজন করেছে।

ফিনল্যান্ডের এই দীর্ঘতম দিন শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি আলো, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের এক অনন্য মিলনমেলা।