
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়তে সিটি গভর্মেন্ট প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক বলে তিনি মত দেন।
শনিবার চট্টগ্রাম কলেজের মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড ২০২৬-এর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, নগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে নগরীর বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত হবে। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল দ্রুত ও সহজে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনশোরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের অর্থনৈতিক জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেয়।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী।
এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইদ খান সাগর এবং ব্র্যাক ব্যাংকের চট্টগ্রাম রিজিওনাল হেড কায়েস চৌধুরী। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের এম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘অর্থনীতির শিক্ষা—দেশ গড়ার দীক্ষা’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই অলিম্পিয়াড অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদ। তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে তুলতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামকে আমরা সবাই বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু একটি শহরকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কিছু মৌলিক কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শক্তিশালী ও কার্যকর নগর সরকার।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই সিটি গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন তিনি। চট্টগ্রামে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু তা খণ্ডিত ও সমন্বয়হীন। এর মূল কারণ হলো নগরীর সেবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এক ছাদের নিচে না থাকা। ফলে পরিকল্পিত ও সমন্বিত নগর উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বের উন্নত নগরীগুলোর উদাহরণ টেনে মেয়র বলেন, লন্ডন, টরন্টো কিংবা অন্যান্য উন্নত শহরগুলো পরিকল্পিত ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে রয়েছে শক্তিশালী সিটি গভর্মেন্ট ব্যবস্থার কারণে। নগর সরকারের অধীনে সব সেবা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করায় তারা দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারছে।
নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও সংগ্রহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। বাকি বর্জ্য খাল, নালা ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নগরের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, এই বর্জ্যই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। ইতোমধ্যে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। হালিশহরে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বায়োগ্যাস প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। পাশাপাশি গ্রিন ডিজেল উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দ্বারে যেতে হচ্ছে। সিটি গভর্মেন্টের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং নগরীর অর্থনৈতিক চাকা আরও গতিশীল হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কৃষি, গার্মেন্টস ও রেমিটেন্সের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন খাত অনুসন্ধানের সময় এসেছে। চট্টগ্রামে পর্যটন, কার্বন ইন্ডাস্ট্রি, ফার্মাসিউটিক্যালস, মাইক্রোচিপ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত নগর সরকার ছাড়া এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও সিটি গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক একটি বিষয় নিয়েও যে এত সুন্দরভাবে তরুণদের মাঝে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়, তা বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের আয়োজকরা প্রমাণ করেছেন। এই প্রতিযোগিতা দেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহ ও জ্ঞানের প্রসার ঘটাবে।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের প্রতি আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। অর্থনীতির একটি দিক তাত্ত্বিক, আরেকটি প্রায়োগিক। এই অলিম্পিয়াডের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অর্থনীতির প্রায়োগিক দিক দিয়ে নাগরিকদের সক্ষম করে তোলা।
পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বলেন, পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আগামীর বিশ্ব প্রযুক্তি ও অর্থনীতি নির্ভর। পরিবর্তিত বিশ্বে টিকে থাকতে তরুণ সমাজকে প্রায়োগিক অর্থনীতি সম্পর্কে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে। এ ধরনের অলিম্পিয়াড এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
১৭ জানুয়ারি দিনব্যাপী এই আয়োজনে তিন স্তরের ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের সভাপতি মো. আল-আমিন পারভেজ জানান, বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে নির্বাচিত বাংলাদেশ দল আন্তর্জাতিক ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডে চারটি পদক অর্জন করে।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের এম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক পরিচালিত ইন্টারেক্টিভ সেশনে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করার, বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যা জানার এবং ক্যারিয়ার পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পায়। পরীক্ষামূলক বাছাই পর্ব শেষে তিনটি ক্যাটাগরিতে শীর্ষ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
জুনিয়র ক্যাটাগরিতে মোসা. সুমাইয়া ইসলাম, মো. আনিসুর রহমান এবং আদিত্য রাজন্না, ইন্টারমিডিয়েট ক্যাটাগরিতে মোহাম্মদ উহান্না, মো. আলমান চৌধুরী ও মো. সাদিক রাশিদ ধন্য এবং এডভান্স ক্যাটাগরিতে সাইয়রনা সোলাইমান সুবাহ, হুর-ই-জান্নাত ও জয় গোপাল বণিক বিজয়ী হন। প্রথম স্থান অর্জনকারীদের নগদ ১০ হাজার টাকা ও সম্মাননা মেডেল প্রদান করা হয়। পাশাপাশি রিজিওনাল ক্যাম্পাস এম্বাসেডর ও লোকাল পার্টনারদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড দেশব্যাপী অর্থনৈতিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। চট্টগ্রাম পর্বের আয়োজক সেন্টার ফর ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভের পরিচালক কাজী রাকীব জানান, এই আয়োজনকে ভবিষ্যতে পুরো বিভাগে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা অর্থনীতি ও ফিনানশিয়াল লিটারেসি বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা জানান, এই অলিম্পিয়াড অর্থনীতির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে ভাবতে শিখিয়েছে। পাঠ্যবইয়ের সূত্র মুখস্থের বাইরে গিয়ে চারপাশের অর্থনৈতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তিন স্তরের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের উপস্থিতির ফলে অনুষ্ঠানটি দেশব্যাপী অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার একটি সংস্কৃতি তৈরি করছে।