রাজবাড়ীতে রিপন হত্যা মামলায় স্বীকারোক্তি, সুজন-চালক কামাল কারাগারে

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

  রাজবাড়ী প্রতিনিধি

রাজবাড়ীতে তেলের টাকা পরিশোধ না করে পালানোর সময় পেট্রল পাম্পের কর্মচারী রিপন সাহাকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামির মধ্যে গাড়ি চালক কামাল হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে মামলার প্রধান আসামি আবুল হাশেম সুজন ও তার গাড়িচালক কামাল হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর বিচারক মো. মহসিন হাসান আসামির জবানবন্দি লিপিবদ্ধ শেষে এ আদেশ দেন।

এর আগে, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত রিপন সাহার ছোট ভাই লিটন সাহা বাদী হয়ে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী থানায় আবুল হাশেম সুজন ও তার গাড়িচালক কামাল হোসেনকে আসামি করে হত্যা ও প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড়ে অবস্থিত করিম ফিলিং স্টেশনে একটি জিপ গাড়ি নিয়ে আসেন জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল হাশেম সুজন ও তার চালক কামাল হোসেন। তারা গাড়িতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার অকটেন নেন। কিন্তু তেলের টাকা পরিশোধ না করেই গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পাম্পে দায়িত্বরত কর্মচারী রিপন সাহা বাধা দিলে তার ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই রিপন সাহার মৃত্যু হয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আবুল হাশেম সুজন ও তার গাড়িচালক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। একই দিন সন্ধ্যায় নিহত রিপনের ভাই লিটন সাহা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

নিহত রিপন সাহার বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর ইউনিয়নের চর খানখানাপুর গ্রামে। দুই ভাইয়ের মধ্যে রিপন ছিলেন বড়। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আবুল হাশেম সুজন পেশায় একজন ঠিকাদার। তিনি ২০১৯ সালে রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন বলে দাবি করা হলেও গত বছরের ১৭ নভেম্বর নিজ বাড়িতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়ী করার আহ্বান জানান।

এদিকে শনিবার কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, আবুল হাশেম সুজন বর্তমানে যুবদলের কেউ নন এবং তার সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। তিনি ২০১৯ সালেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। ভবিষ্যতে তার নাম যুবদলের সঙ্গে জড়িয়ে সংবাদ পরিবেশন না করার অনুরোধ জানানো হয়।

এছাড়া আবুল হাশেম সুজনের বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধমূলক অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী এলাকা থেকে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ তাকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও তিন রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করে। ওই মামলায় তিনি পরে জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তীতে রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড়মুরারীপুর গ্রামের একটি বসতবাড়িতে হামলা, মারধর, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা আরেক মামলায় গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকেও তিনি জামিনে মুক্তি পান।

রাজবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার জিয়াউর রহমান জানান, করিম ফিলিং স্টেশনে সংঘটিত ঘটনায় গাড়ি চালক কামাল হোসেন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি শেষে আদালত দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত রিপন সাহার পরিবার দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।