প্রবাসী রেমিট্যান্সে বদলে যাচ্ছে শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ
এসএম মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর

শরীয়তপুর জেলার অর্থনৈতিক মানচিত্রে যে কটি উপজেলা দ্রুত বদলে যাওয়ার বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে নড়িয়া উপজেলা অন্যতম। একসময় গ্রামীণ বাজার, সাদামাটা বসতি আর সীমিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিচিত নড়িয়া আজ আধুনিক অবকাঠামো, সমৃদ্ধ বাজারব্যবস্থা ও প্রবাসী রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
নড়িয়া মূলত প্রবাসী অধ্যুষিত একটি এলাকা। ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কর্মরত নড়িয়ার হাজারো প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স বদলে দিয়েছে এখানকার জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক চিত্র।
এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাদের কোনো না কোনো সদস্য প্রবাসে নেই। এই বৈশ্বিক সংযোগই নড়িয়াকে এনে দিয়েছে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও আধুনিকতার ছোঁয়া।
উপজেলা সদরের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সময়ের পরিবর্তন। সাধারণ দোকানঘরের জায়গায় গড়ে উঠেছে আধুনিক শপিং কমপ্লেক্স, বহুতল মার্কেট আর বিদেশি পণ্যে ঠাসা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাজারে ক্রেতাদের ঝোঁক এখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিদেশি পণ্যের দিকে। কাপড়, ইলেকট্রনিকস, কসমেটিকস—সবখানেই প্রবাসী রুচি ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
নড়িয়ার আবাসন চিত্রও বদলে গেছে আমূল। রেমিট্যান্সের অর্থে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত হয়েছে নান্দনিক নকশার ডুপ্লেক্স ও বহুতল ভবন। প্রশস্ত বারান্দা, আধুনিক ইন্টেরিয়র ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে এসব বাড়ি নড়িয়াকে উপস্থাপন করেছে জেলার এক অলংকার হিসেবে।
যদিও এই সুদৃশ্য কিছু সংখ্যক বাড়িতে নিয়মিত বসবাস নেই। পরিবারের কেউ প্রবাসে, কেউ শহরে। তবে ঈদ-পার্বণ কিংবা বিশেষ উৎসবে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে এলে নড়িয়া রূপ নেয় উৎসবমুখর জনপদে।
তবে উন্নয়নের এই ইতিবাচক ধারার পাশাপাশি কিছু অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উপজেলা সদরের পশ্চিম পাশে কীর্তিনাশা নদীর ওপর একটি সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় এক দশক ধরে অসম্পূর্ণ থাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রথম পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটিতে বড় যান চলাচল বন্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে নতুন একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের উদ্যোগের ফলে ভেঙ্গে ফেলা হয়। তার পর থেকেই ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পারাপারের কারণে সময় ও অর্থ দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকেও ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত এই সেতুর কাজ শেষ হলে নড়িয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও প্রসারিত হবে।
নড়িয়া পৌর বাজার বস্ত্র মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই প্রবাসীনির্ভর। বাজারে অধিকাংশ ক্রেতাই বিদেশি পণ্য খোঁজেন। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই এই বাজারকে গতিশীল রেখেছে।”
তার মতে, প্রবাসীদের অবদানের কারণে নড়িয়ার বাজার আজ জেলার অন্যতম সমৃদ্ধ বাজারে পরিণত হয়েছে।
একই সুর শোনা যায় নড়িয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বেপারীর কথায়। তিনি বলেন, “রেমিট্যান্সনির্ভর নড়িয়া আজ ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। এখানকার বিলাসবহুল সুদৃশ্য বাড়িঘর যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। নড়িয়ার প্রবাসীরা আমাদের অহংকার।”
তিনি আরও মনে করেন, নড়িয়া উপজেলা আজ শরীয়তপুর জেলার একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী মডেল। প্রবাসীদের শ্রম, মেধা ও রেমিট্যান্সের অর্থে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক ভিত্তি শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকেও প্রসারিত করেছে।
সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে নড়িয়া ভবিষ্যতে জেলারই নয়, দেশের রেমিট্যান্সনির্ভর স্থানীয় উন্নয়নের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
