প্রদর্শনী ও প্রণোদনায় গমের বাম্পার ফলন, ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কৃষি অর্থনীতি

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

  মো. মোশারফ হোসাইন, নকলা (শেরপুর)

শেরপুর জেলার নকলা উপজেলায় চলতি রবি মৌসুমে গম চাষে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। এই মৌসুমে উপজেলার ২১০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ করা হয়েছে। নাম মাত্র শ্রমে, অল্প ব্যয়ে ও স্বল্প সময়ে গমের আবাদ করে কৃষকরা অধিক লাভ পাওয়ায় এবং সময়মতো প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষি বিভাগ থেকে বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ পাওয়ায় কৃষকেরা গম চাষে আগ্রহী হয়েছেন। গমের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবছর উপজেলার ১৬০ জন কৃষকের মাঝে উন্নতমানের গমের বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়েছে। কৃষকদের মতে, প্রণোদনা সহায়তা ও নিয়মিত কৃষি পরামর্শ চাষাবাদে ঝুঁকি কমিয়েছে এবং উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গম চাষ সম্প্রসারণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় মোট ১০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব প্রকল্পের অধীনে ৩টি, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ৩টি ও গম গবেষণা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে ৪টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা রয়েছে। প্রদর্শনী প্লটে উন্নত জাতের গম, সুষম সার প্রয়োগ ও সমন্বিত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হচ্ছে, যা দেখে স্থানীয় কৃষকেরা উৎসাহিত হচ্ছেন। এতে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।

মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন এলাকার প্রদর্শনী প্লটগুলোতে উন্নত জাতের গম উৎপাদন, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চাষপদ্ধতির ব্যবহার দেখানো হচ্ছে। এসব প্লট দেখে আধুনিক পদ্ধতিতে গম চাষে আশপাশের কৃষকেরাও আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, সময়মতো সহায়তা পাওয়ায় তারা গম চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। প্রণোদনা সহায়তা শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, বরং কৃষকদের আর্থিক ঝুঁকিও কমাবে বলেও মনে করছেন তারা।

এ বছর উপজেলার বানেশ্বরদী, পাঠাকাটা, টালকী, চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি গম চাষ হয়েছে। এছাড়াও গণপদ্দী, নকলা, উরফা, গৌড়দ্বার ইউনিয়নসহ নকলা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাতে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে গম চাষ করেছেন। এসব এলাকায় মাটির গুণাগুণ ও সেচ সুবিধা ভালো থাকায় এবং আবহাওয়া গম চাষে অনুকূলে থাকায় গম চাষে কৃষকের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনেক কৃষক ধানের পাশাপাশি বিকল্প ফসল হিসেবে গম বেছে নিচ্ছেন, যাতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ্জ মো. ছায়েদুল হক জানান, নকলার প্রায় সব এলাকাতেই কম-বেশি গমের আবাদ করা হয়েছে। মাঠে এখন যে সবুজ স্বপ্নের ফসল আছে, তা শুধু গমের শীষ নয়; এ যেন কৃষকের আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন পূরণের প্রতিচ্ছবি।

তিনি আরো জানান, তাদের কৃষক সংগঠনের অধিকাংশ কৃষক-কৃষানি নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য হলেও ধানসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি গম চাষ করেছেন। চাহিদা বেশি ও ভালো দাম থাকায় আগামীতে কম করে হলেও সবাই গম চাষ করবেন।

সংগঠনটির সদস্য মোখলেছুর রহমান জানান, আগে একটা সময় ছিল, যখন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের লোকজন বছরে অন্তত ৫-৬ মাস গমের তৈরি আটার রুটি খেতেন। আগে গমের ও আটার দাম কম ছিল। তাই অল্প আয়ের লোকজন আর্থিক দৈন্যতার কারণে বাধ্য হয়ে সহজপ্রাপ্য ও সহজলভ্য আটার রুটি খেতেন। আর এখন বিভিন্ন কারণে রুটি অপেক্ষাকৃত ধনাঢ্য লোকের খাবারের অন্যতম স্থান দখল করে নিয়েছে। এদিকে সার্বিক কারণে গমের আবাদ কমে যাওয়ায় এবং চাহিদা বেশি থাকায় আটার দাম চালের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি। তাই দিন দিন আটা উৎপাদনকারী গম চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষক।

বানেশ্বরদী ইউনিয়নের বানেশ্বরদী গ্রামের কৃষক শিবলু মিয়া জানান, বাংলাদেশ ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্রের আওতায় ২০ শতাংশ করে জমিতে প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তাগণ নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছেন। এরই মধ্যে কয়েকবার প্রদর্শনী পরিদর্শন করেছেন তারা। তাদের পাশাপাশি উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যেই সরাসরি ও মোবাইলে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। নাম মাত্র খরচের গম চাষে তেমন কোন ঝুঁকি নেই; তবে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। খেত থেকে ইঁদুর তাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কিছুটা কমেছে বলে তিনি জানান। ধানের তুলনায় গমে বেশি লাভ পাবেন বলে জানান এই শিক্ষিত তরুণ কৃষক।

উপজেলার বানেশ্বরদী ব্লকে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ডিপ্লোমা কৃষিবিদ হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘নকলা উপজেলার প্রায় সব এলাকার মাটি গম চাষের উপযোগী। এই এলাকায় সামান্য পরিমাণ সার, প্রয়োজনীয় ২/৩টা সেচ ও নাম মাত্র শ্রমে গমের বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব, যা অন্য কোনো আবাদে অসম্ভব। তাই কৃষকরা ধানসহ অন্যান্য আবাদ ছেড়ে গম চাষে ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছেন।’

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে জানান, চলতি মৌসুমে রাজস্ব, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্রের আওতায় উপজেলায় মোট ১০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে গমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলনের লক্ষণ দেখে গম চাষীদের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। গম চাষীরা লাভবান হওয়ায় অন্যান্য কৃষকরা আগ্রহী হয়েছেন।

অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা জানান, দেশে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাতের গম চাষ করা হয়। এর মধ্যে বারি গম-২৫, বারি গম-২৬, বারি গম-২৭, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২ জাতের গম বেশি আবাদ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিডব্লিউএমআরআই গম-৪ সহ উন্নত জাতের বিভিন্ন গমের আবাদ বেশি করা করেছেন। উপজেলায় যেসব জাতের গমের প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে, সব কয়টাই উন্নত জাতের ও বিডব্লিউএমআরআই গম-৪ জাতের।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, চলতি মৌসুমে সরাসরি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে গমের আবাদ করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদি এই খাদ্য শস্য চাষে কৃষকরা লাভ বেশি পাচ্ছেন। অনুকূল আবহাওয়া বজায় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলায় না পড়লে এ বছর গমের বাম্পার ফলন হবে। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকে বাড়তি আয়ে সহায়ক হবে। পতিত ও অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে গম চাষ করে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন। আগামীতে গমের আবাদ কয়েক গুণ বাড়বে, ফলে অনেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাবলম্বী হবেন বলে তিনি আশাব্যক্ত করেন। এই শস্য আবাদে ব্যয়ের তুলনায় কৃষকরা কয়েকগুণ লাভ পেয়ে থাকেন। অধিক লাভজনক গম চাষ আগামীতে একদিকে যেমন কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান; এমন মন্তব্য করেন কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান।