ফেসবুকের কল্যাণে নকলার অনাথ মুন্নার স্বপ্নপূরণ

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

  নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি

দেড় বছর বয়সে ট্রেন দুর্ঘটনায় একটি পা হারানো, পিতা-মাতার পরিচয়হীন এতিম মুন্নার জীবনে সব হারানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ভাতের কষ্ট যেন ছিল নিত্যসঙ্গী। সরকারি অনাথ আশ্রম, সরকারি শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ও সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে বেড়ে ওঠা এই পঙ্গু যুবকের একটাই চাওয়া ছিল একটি অটোরিকশা। সেই অটোরিকশাই হবে তার বেঁচে থাকার ভরসা।

অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে এবং মানবিক উদ্যোগে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো।

সোমবার দুপুরে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার বারমাইসা গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে মুন্নার হাতে ব্যাটারিচালিত পাঁচ সিটের একটি অটোরিকশার চাবি তুলে দেওয়া হয়।

পুরো অটোরিকশাটি উপহার হিসেবে কিনে দিয়েছেন মানবিক উদ্যোগে সক্রিয় আব্দুল মালেকের ফেসবুক বন্ধুরা। জানা গেছে, পাঁচ সিটের একটি অটোরিকশার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

মুন্নার জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরে আব্দুল মালেক ও নকলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর হোসেন তাদের নিজ নিজ ফেসবুক টাইমলাইনে একটি আবেদনময় পোস্ট দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, দুনিয়ার সব সুখ হয়তো মুন্নার কপালে নেই, কিন্তু অন্তত দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পেতে একটি অটোরিকশা তার খুব প্রয়োজন। অটোরিকশা হলে নিজের আয়েই খাদ্যের কষ্ট দূর করতে পারবে সে।

পোস্টটি দ্রুতই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফেসবুক পোস্ট থেকে স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু হয়। একের পর এক মানুষ আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। সহায়তাকারীদের নাম ও অর্থের পরিমাণ স্বচ্ছতার সঙ্গে ফেসবুকেই প্রকাশ করা হয় বলে জানান আব্দুল মালেক।

তিনি বলেন, ‘মুন্নার জন্য যে বা যারা আর্থিক সহায়তা করেছেন, তাদের প্রত্যেকের নাম ও অনুদানের পরিমাণ যথাযথভাবে ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

মুন্নার বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখন ঢাকার স্টাফ রোড রেলক্রসিংয়ে মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি ও তার মা। এক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় তার জীবন চলার সুন্দর যাত্রা। দুর্ঘটনায় মুন্নার ডান পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় কর্তব্যরত সেনাসদস্যরা তাদের উদ্ধার করে ক্যান্টনমেন্ট সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পরই মারা যান মুন্নার মা। তবে চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও যথাযথ চিকিৎসায় মুন্না প্রাণে বেঁচে যায়। হাসপাতালের এক অজ্ঞাত আয়া তার সেবাযত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর কারণে তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে মুন্না হয়ে পড়ে এক বেওয়ারিশ অনাথ শিশু।

পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকার সরকারি অনাথ আশ্রম ‘ছোট মনি নিবাসে’ পাঠান। সেখানে প্রায় ১০ বছর কাটানোর পর বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তাকে মুন্সিগঞ্জ জেলার সরকারি শিশু পরিবারে স্থানান্তর করা হয়। কৈশোরে পা রাখার পর নিজের পরিচয়, বাবা-মায়ের নাম কিংবা আপন ঠিকানা না জানার বেদনা তাকে ভেতর থেকে নাড়া দিতে থাকে। এক সময় মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মুন্সিগঞ্জের সরকারি শিশু পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে আসে মুন্না।

একটি পা না থাকায় স্বাভাবিকভাবে কাজ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ তাকে কাজ দিতেও আগ্রহী ছিল না। সরকারি আশ্রমে বেড়ে ওঠায় কোনো পেশাগত দক্ষতাও গড়ে ওঠেনি তার।

এ সময় মুন্সিগঞ্জে কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাদের মাধ্যমেই মুন্না চলে আসে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার বারমাইসা গ্রামে। সেখানেই শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়।

মুন্নার জীবনকথা শুনে এবং সরকারি আশ্রয়ে থাকার কাগজপত্র যাচাই করে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার পিতামাতা অজ্ঞাত রেখে জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করে দেন। পাশাপাশি সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় একটি ঘরের ব্যবস্থাও করা হয়। প্রশাসনের সহায়তায় সে পায় নতুন ঠিকানা।

এলাকাবাসীর উদ্যোগে আরেকজন অনাথ নারীর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে তার স্থায়ী ঠিকানা শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার ৩ নম্বর উরফা ইউনিয়নের বারমাইসা গ্রাম। মা–বাবা বা আত্মীয়স্বজনের খোঁজ না থাকলেও এখানকার মানুষই এখন তার আপনজন। তবুও কমছে না পরিবার-পরিজনের পরিচয়ের খোঁজে তার অস্থিরতা।

সোমবার অটোরিকশার চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নকলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোশারফ হোসাইন, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর হোসেন, অর্থবিষয়ক সম্পাদক আব্দুলাহ আল-আমীন, স্থানীয় সাইফুল ইসলাম, হামিদুল হক, শ্রী প্রণয় চন্দ্র বর্মন ও শ্রী নিখিল চন্দ্র বর্মণসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অটোরিকশার আয়েই এখন মুন্নার সংসার চলবে। এই অটোরিকশাই এখন তার জীবিকার একমাত্র ভরসা। অন্তত খাবারের কষ্ট দূর হবে। অনেকে মনে করেন, তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও সততায় বোঝা যায় সে একটি ভালো পরিবারের সন্তান। জন্মগতভাবেই তার ভেতরে রয়েছে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতাসহ সকল ইতিবাচক স্বভাব।

দীর্ঘ বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা ও কষ্টের পর অবশেষে একটি অটোরিকশা মুন্নার জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট যে কখনো কখনো একটি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ নকলার অনাথ মুন্না।