ঐতিহাসিক ঘোড়াঘাট: গৌরবময় অতীত থেকে অবহেলিত জনপদ

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

  সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এক সময় ছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। মোগল আমলের প্রতাপশালী এই জনপদ কালের বিবর্তনে এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ ও অবহেলিত। প্রশাসনিক গুরুত্ব হারানো এই এলাকাটি বর্তমানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত একটি উপজেলা হিসেবে টিকে আছে।

জেলা সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে দীর্ঘ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন ঘোড়াঘাটকে পিছিয়ে রেখেছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে ‘ঘোড়াঘাট সরকার’ ছিল একটি বিশাল প্রশাসনিক ইউনিট।

কর আদায়, রাজস্ব সংগ্রহ এবং সামরিক ঘাঁটি হিসেবে এখানে দুর্গ ও রাজবাড়ি গড়ে উঠেছিল। অথচ আজ সেই সোনালি অতীতের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপনাগুলো ধ্বংসের মুখে।

স্থানীয়দের আক্ষেপ, প্রশাসনিক উদাসীনতায় স্বাধীনতার পর থেকে এই এলাকার উন্নয়নের চাকা থমকে গেছে।

বর্তমানে প্রায় দেড়শ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস থাকলেও নাগরিক সেবা পেতে তাদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রাণকেন্দ্র ঘোড়াঘাট থানা ভবনটির অবস্থা এখন শোচনীয়।

১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানার বর্তমান ভবনটি ফাটল ও বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যায় জর্জরিত। পুলিশ সদস্যদের জন্য আবাসন সংকট প্রকট হওয়ায় তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরোনো ছাদের নিচেই অবস্থান করতে হচ্ছে।

থানার ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও নেই আধুনিক কোয়ার্টার বা নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। দেশের বিভিন্ন থানায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই ঐতিহাসিক জনপদের থানাটি এখনও উন্নয়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও সন্তোষজনক নয়। উপজেলায় প্রায় ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩০টি উচ্চ বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের পাড়ি দিতে হয় অনেক দূর। উপজেলা পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় বা মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের।

অন্যদিকে, এলাকার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখানে চিকিৎসক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে। 

প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, ঘোড়াঘাট কেবল একটি উপজেলা নয়, বরং এটি বাংলার ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়। সরকারের উচিত এই ঐতিহাসিক জনপদটির ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা।

প্রাচীন স্থাপনা সংস্কার করে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা এবং প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলে ঘোড়াঘাট আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই জনপদের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।