নকলায় মরিচের ঝাঁজে সবুজ বিপ্লব, কৃষকের মুখে হাসি
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ১৯:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ
মো. মোশারফ হোসাইন, নকলা (শেরপুর)

শেরপুরের নকলায় চলতি রবি মৌসুমে মরিচ চাষে এক প্রকার বাজিমাত করেছেন কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩৪০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো উপকরণ সরবরাহ এবং কৃষকদের আগ্রহ এই তিনের সমন্বয়েই এমন সাফল্য সম্ভব হয়েছে। এ যেন, লাল মরিচের ঝাঁঝে নকলার মাঠে সবুজ বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। ফলন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
এ বছর উপজেলায় বিজলি, বিজলি প্লাস ও বালিঝুরি এমনসব জনপ্রিয় ও উচ্চ ফলনশীল জাতের মরিচ বেশি চাষ করা হয়েছে। এসব জাত স্বল্প সময়ে ফলন দেয় এবং রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজলি ও বিজলি প্লাস জাতের মরিচের রং, আকার ও ঝালমাত্রা বাজারে ভালো চাহিদা তৈরি করেছে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মরিচ চাষ সম্প্রসারণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ২২টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্লটের জমির পরিমাণ ৩৩ শতক করে। এসব প্রদর্শনীতে নির্বাচিত কৃষকদের মাঝে উন্নতমানের বীজ, রাসায়নিক ও জৈব সার এবং প্রয়োজনীয় বালাইনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে। উন্নত জাত ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কমে আসে এবং ফলন বাড়ে। ফলে কৃষকের লাভের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এতে অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন এবং নিজেদের জমিতে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করছেন কৃষকরা। উন্নত জাতের মরি ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারমূল্য সন্তোষজনক থাকায় কৃষকদের আগ্রহ কয়েক গুণ বেড়েছে।
সরেজমিনে ইউনিয়নভিত্তিক চাষের চিত্র ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার উরফা, বানেশ্বরদী, পাঠাকাটা, চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয়েছে। এসব এলাকার মাটি ও আবহাওয়া মরিচ চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে আবাদ করেছেন। বিশেষ করে চরঅষ্টধর, চন্দ্রকোনা, বানেশ্বরদী ও উরফা ইউনিয়নে ব্যাপক আকারে মরিচের ক্ষেত চোখে পড়ছে।
উরফা ইউনিয়নের কোদালজা বাজার (কোদালধোয়া ঘাট) এলাকার মরিচ চাষি নুর ইসলাম জানান, সে ২০ শতক জমিতে দেশীয় জাতের মরিচ চাষ করেছেন। জমি তৈরি, বীজ বপন, শ্রমিক মজুরি, সার ও সেচ বাবদ এ পর্যন্ত তার ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খেত থেকে মরিচ তোলার শ্রমিক মজুরিসহ মোট খরচ হবে ১৪ হাজার থেকে ১৫ টাকা। এই ২০ শতক জমিতে ৪ থেকে ৫ মণ শুকনা মরিচ পাবেন। এতে বাজার মূল্য মোতাবেক আয় হতে পারে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। যা অন্য কোনো আবাদে প্রায় অসম্ভব। তাই দিন দিন অন্যান্য কৃষকরা মরিচ চাষে ঝুঁকছেন।
একই এলাকার মরিচ চাষি উসমান আলী ১৫ শতক, ছায়েদুল ইসলাম ২০ শতক, আলাল উদ্দিন ২০ শতক, দুজাহান মেম্বার ১০ শতক, মিরাজ আলী ২০ শতক, চানু মিয়া ১০ শতক ও লেদ্দা মিয়া ৩০ শতক জমিতে বিভিন্ন জাতের মরিচ চাষ করেছেন। এছাড়া ওই এলাকার অন্তত অর্ধশত কৃষক অন্যান্য আবাদের পাশাপাশি মরিচ চাষ করেছেন।
চাষীরা জানান, তাদের চাষ করা মরিচে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও অতিরিক্ত থাকে; যা বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন তারা। অনেক কৃষক এবার ধান বা অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে মরিচ চাষে ঝুঁকেছেন, কারণ স্বল্প সময়ে নগদ অর্থ পাওয়া যায়।
ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ্জ মো. ছায়েদুল হক জানান, নকলার প্রায় সব এলাকাতেই কম-বেশি মরিচের আবাদ করা হয়েছে। মাঠে এখন যে লাল-সবুজ স্বপ্নের ফসল আছে, তা শুধু মরিচের ঝাঁজে নয়; এ যেন কৃষকের আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন পূরণের প্রতিচ্ছবি।
তিনি আরো জানান, তাদের কৃষক সংগঠনের অধিকাংশ কৃষক-কৃষানি নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য হলেও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি মরিচ চাষ করেছেন। মরিচের বাজারদর অনুকূলে থাকলে আগামীতে মরিচের আবাদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় আগামীতে তারা সবাই মরিচ চাষ করবেন। নকলায় মরিচ চাষ কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হিসেবে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে মরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কার হলেও, এ পর্যন্ত ৩৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। এবার উপজেলার চরাঞ্চলসহ প্রায় প্রতিটি এলাকায় মরিচ ফলনের লক্ষণ দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা জানান, চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ২২টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদর্শনীতে মরিচের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার আশাব্যক্ত করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, স্বল্প মেয়াদি এই মসলা জাতীয় ফসল চাষে কৃষকরা কয়েক বছর ধরে লাভ বেশি পাচ্ছেন। সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এবং অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে ও বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলায় না পড়লে এ বছর মরিচের বাম্পার ফলন হবে। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকে বাড়তি আয়ে সহায়ক হবে।
তিনি আরও জানান, বাজারদর ভালো থাকলে কৃষকরা অন্যান্য ফসলের তুলনায় মরিচে লাভ কয়েকগুণ বেশি পাবেন। অল্প ব্যয়ে ও কম জমিতে স্বল্প শ্রমে মরিচ চাষ করে যেকেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন। ফলে অধিক লাভজনক মরিচ চাষ আগামীতে একদিকে যেমন কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। ভবিষ্যতে মরিচ চাষকে লাভজনক ও টেকসই করতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা ও উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান।
স্থানীয় কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, নকলায় মরিচ চাষের এ অগ্রগতি শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধি নয়, বরং উপজেলার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আগামী মৌসুমে মরিচের আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি আবাদ অর্জনের মাধ্যমে নকলায় মরিচ চাষে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। কৃষক ও কৃষি বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ধারা অব্যাহত থাকবে; এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
