কালের সাক্ষী জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ আজও দাঁড়িয়ে

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  এমদাদুল ইসলাম ভূট্টো, ঠাকুরগাঁও

কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ। ১৭৮০ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও মসজিদ নির্মাণে সময় লেগে যায় প্রায় ২১ বছর। মসজিদটি ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর-এর আওতায় ২০০৬ সালে অন্তর্ভুক্ত হলেও এখনও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ। জেলায় ছড়িয়ে থাকা অনেক পুরাকীর্তির মধ্যে প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো এ মসজিদটি নির্মাণশৈলী ও অপূর্ব কারুকাজে যে কোনো মানুষকে মুগ্ধ করে।

১৭৮০ শতাব্দীতে মসজিদটির ভিত্তি স্থাপন করেন তৎকালীন জমিদার জামাল উদ্দীন চৌধুরী। তার নামানুসারেই নামকরণ করা হয় জামালপুর জামে মসজিদ এবং এলাকার নাম বসন্তনগর থেকে পরিবর্তিত হয়ে হয় জামালপুর। পরে জামালপুর ইউনিয়ন।

জামালপুর চৌধুরী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম বাংলার তৎকালীন উত্তর দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট মহকুমার রায়গঞ্জ থানার বারো পরগনা তাজপুর গ্রামে পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হালিম। ১৭৬৫ শতাব্দীর দিকে আব্দুল হালিম কাপড়ের ব্যবসার উদ্দেশ্যে তাজপুর থেকে বসন্তনগরে আসেন, যার বর্তমান নাম জামালপুর, এবং সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করেন।

কাপড়ের ব্যবসা করতে করতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের জমিদার লালা মুক্তি প্রসাদ নন্দের কাছ থেকে লাটের পারপূগী মৌজার প্রায় এক হাজার বিঘা জমি কেনার মাধ্যমে জমিদারি পান আব্দুল হালিম চৌধুরী। ১৭৭০ দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া প্রশাসন তাকে চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করে।

জমিদার থাকাকালীন পর্যায়ক্রমে তিনি মোট ২৬ হাজার একর জমি কিনেছিলেন। বর্তমানে সেই জমিগুলো তিন জেলার আট থানায় পড়েছে। থানাগুলো হলো—আটোয়ারি, বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর, রায়গঞ্জ, রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ, বীরগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁও। তখন তিনি ব্রিটিশ চৌধুরী নামে খ্যাত ছিলেন।

জানা যায়, আব্দুল হালিম চৌধুরী ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে তার রাজপ্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। রাজপ্রাসাদের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ চলাকালীন ১৭৮০ দশকে ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ থেকে মিস্ত্রি এনে এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি। এর কিছুদিন পর আব্দুল হালিম চৌধুরীর মৃত্যু হলে জমিদারত্ব পান তার ছেলে রওশন আলী চৌধুরী।

পরে রওশন আলী চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে জামাল উদ্দীন চৌধুরী জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং মসজিদের নির্মাণকাজ চালু রাখেন। জামাল উদ্দীন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার ছেলে নুনু মোহাম্মদ চৌধুরী ১৮০১ দশকে মসজিদটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। মসজিদটি নির্মাণ করতে চার পুরুষের প্রায় ২১ বছর সময় লাগে।

মসজিদ নির্মাণের প্রধান দুই মিস্ত্রি হংস রাজ ও রামহিত হিন্দু ধর্মের ছিলেন। জমিদারবাড়ির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় মসজিদের ব্যয়বহুল নির্মাণ শেষ হলেও জমিদারবাড়িটির নির্মাণ অসমাপ্ত থেকে যায়।

জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদ অঙ্গনে প্রবেশমুখে একটি বড় ও সুন্দর তোরণ রয়েছে। মসজিদটির শিল্পকলা দৃষ্টিনন্দন, মনোমুগ্ধকর ও প্রশংসাযোগ্য। মসজিদে বড় আকৃতির তিনটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের শীর্ষদেশে পাথরের কাজ করা।

এই মসজিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মিনারগুলো। মসজিদের ছাদে ২৪টি মিনার আছে। একেকটি মিনার ৩৫ ফুট উঁচু এবং প্রতিটিতে নকশা করা রয়েছে। গম্বুজ ও মিনারের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে অপূর্ব সৌন্দর্য। এত মিনার সচরাচর কোনো মসজিদে দেখা যায় না।

মসজিদটির চারটি অংশ রয়েছে—মূল কক্ষ, মূল কক্ষের সঙ্গে ছাদসহ বারান্দা, ছাদবিহীন বারান্দা এবং ছাদবিহীন বারান্দাটি অর্ধপ্রাচীরে বেষ্টিত হয়ে পূর্বাংশে মাঝখানে চার থামের ওপর ছাদবিশিষ্ট মূল দরজা। খোলা বারান্দার প্রাচীরে এবং মূল দরজার ছাদে ছোট ছোট মিনারের অলংকার রয়েছে। মসজিদটির মূল দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ১১ ফুট ৯ ইঞ্চি। মসজিদের বারান্দা দুটি।

প্রথম বারান্দার দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ২ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১১ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং দ্বিতীয় বারান্দার দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট ২ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১৯ ফুট ৫ ইঞ্চি। মূল কক্ষের কোণগুলো তিন থামবিশিষ্ট। এর জানালা দুটি, দরজা তিনটি এবং কুলুঙ্গি দুটি। মসজিদের ভেতরের দরজা, বারান্দা এবং বাইরের দেয়ালগুলোতে প্রচুর লতাপাতা ও ফুলের সুদৃশ্য নকশা রয়েছে। একসঙ্গে এই মসজিদে ৩০০ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে।

১৮৮৫ সালের দিকে ইমদাদুর রহমান চৌধুরী বসন্তনগরের নাম পরিবর্তন করে জামাল উদ্দীন চৌধুরীর নামানুসারে জামালপুর নামকরণ করেন। বর্তমানে এটি জামালপুর এস্টেট নামে পরিচিত।

মসজিদ দেখতে আসা সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যা আগে কখনো দেখিনি, তা এখানে এসে দেখে অভিভূত হলাম। যেহেতু এটি অতি পুরোনো একটি মসজিদ, তাই এটিকে সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। মসজিদটি সংরক্ষণ করা গেলে এটির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে।’

এখানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা মসজিদের কারুকাজ দেখে অবাক হয়ে বলেন, সরকার যদি মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে এটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এটি দেখতে পারবে।

জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা নূরুল আনোয়ার চৌধুরী বলেন, ১৯৬৫ সালের দিকে মসজিদের ১১টি মিনার ঝড়-বৃষ্টিতে ভেঙে যায়। তার মধ্যে সাতটি মিনার তৎকালীন চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা মেরামত করেন এবং আরও চারটি মিনার এখনো ভাঙা অবস্থায় আছে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার যদি মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য সুদৃষ্টি দেন, তাহলে এটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকবে।

১৯৯৫ সাল থেকে মসজিদের ইমামতি করে আসছেন হাফেজ মো. রুহুল আমীন। তিনি বলেন, ‘মসজিদটি দেখতে শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিদেশ থেকেও মানুষ আসেন। এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন।’

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইরশাত ফারজানা বলেন, জামালপুর জমিদারবাড়ি জামে মসজিদটি সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যাতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে, সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।