মুন্সীগঞ্জের শ্যামল হত্যাকাণ্ডে কৃষকলীগ নেতাসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৫:১২ | অনলাইন সংস্করণ
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলইতে প্রায় ৩ বছর আগে প্রবাসী যুবক শ্যামল বেপারীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা মামলায় তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং আট জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক শ্যাম সুন্দর রায় এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— কৃষক লীগ নেতা শাহাদাত বেপারী, জাহাঙ্গীর বেপারী, ইব্রাহিম বেপারী।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— মনির চৌকিদার, হায়াতুল ইসলাম চৌকিদার, হাবিব বেপারী, আশরাফুল খান, হুমায়ুন দেওয়ান, এমদাদ হালদার ওরফে ইমরান, আইয়ুব খাঁ ও লিটন বেপারী।
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবুল কালাম আজাদ বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের দণ্ডের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে শাহাদাত বেপারী কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া ইব্রাহিম বেপারী, হাবিব বেপারী, এমদাদ হালদার এবং লিটন বেপারী পলাতক; অপর ৬ আসামি জামিনে ছিলেন।
জাহাঙ্গীর বেপারী ছাড়া অপর আসামিরা আদালতে হাজির হন। জাহাঙ্গীর অসুস্থ থাকায় সময় আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে দেয়। জাহাঙ্গীরের জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এছাড়া পলাতক অপর আসামিদের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের পূর্ব রাখি গ্রামে ২০২৩ সালের ১৩ জুন শ্যামল খাওয়াদাওয়া শেষে রাত ১০টার দিকে ঘুমিয়ে পড়েন। পূর্ববিরোধের জের ধরে রাত ১টার দিকে এমদাদ জরুরি কথা আছে বলে শ্যামলকে ডেকে তোলে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে শাহাদাত ভিকটিমের হাতে দুটি গুলি করে। জাহাঙ্গীর গুলি করে পায়ে। ইব্রাহিম বেপারীও পায়ে দুটি গুলি করে। আরও দুইজন শ্যামলকে গুলি করে।
“শ্যামল ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে তারা টেনে-হেঁচড়ে বাইরে উঠানে নিয়ে এসে মারধর করে গুরুতর আহত করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে হাবিব মাথায় গুলি করে। এর পর শ্যামলের মুখ দিয়ে গোঙানি হতে থাকলে শাহাদাত বেপারী চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথার মাঝ বরাবর কোপ দেয়। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে আসামিদের কয়েকজন ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলে যায়।”
এর পর ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া বাচ্চু ফোন করে ঘটনাটি শ্যামলের ছোট ভাই ইব্রাহিম বেপারীকে জানায়। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনার দুই দিন পর ১৫ জুন ইব্রাহিম মিয়া মুন্সীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখান থেকে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত-৩-এ পাঠানো হয়। গত বছরের ১৪ জুলাই ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।
মামলার বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনাল ৩৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে। আসামি শাহাদাত বেপারী এবং হায়াতুল ইসলাম নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় ট্রলারঘাটের ইজারা, নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, আধিপত্য বিস্তার ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে শ্যামলের নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে শাহাদাতের বিরোধ হয়। এরই জেরে খুন হন শ্যামল বেপারী।
হত্যাকাণ্ডের আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহাদাতের পরিকল্পনায় ও উপস্থিতিতে শ্যামলের ভাইদের স্থানীয় দিঘিরপাড় বাজারে কুপিয়ে জখম করা হয়।
এ ঘটনায় নিহত শ্যামল বাদী হয়ে শাহাদাত ও তার ছেলে মহিউদ্দিনসহ অন্য সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার পর শাহাদাত আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু তার ছেলে মহিউদ্দিন বেপারী ও তার এক সহযোগী গ্রেপ্তার হন। পরে শাহাদাত ও তার ছেলে আদালত থেকে ওই মামলায় জামিন পান।
এ মামলার কারণে আত্মগোপনে থাকার সময়ে শ্যামলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন শাহাদাত বেপারী। পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহাদাত আগে থেকেই আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও ধারালো অস্ত্র সংগ্রহ করে রাখেন। শাহাদাত ১৫-২০ জনসহ গত ১৪ জুন রাত দেড়টার দিকে শ্যামলের বাড়িতে চার দিক থেকে ঘেরাও করে হামলা চালান। তারা ঘরে ঢুকে শ্যামলকে গুলি করে ও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে গুলি করে ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
নিহত শ্যামল বেপারী ২০০৪ সাল থেকে মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক দেশে চাকরি করেন। ২০২২ সালের জুলাই মাসে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন কৃষক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত শাহাদাত বেপারী এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য তার ছেলে মহিউদ্দিন বেপারীসহ ১৫-২০ জনের একটি বাহিনী পরিচালনা করতেন।
নিহত শ্যামল বেপারী শিলই ইউনিয়নের পূর্ব রাখি গ্রামের মৃত আব্দুল গনি বেপারীর ছেলে। সাজাপ্রাপ্ত শাহাদাত বেপারী একই ইউনিয়নের দেওয়ানকান্দি এলাকার মো. শামছুজ্জামান বেপারীর পুত্র।
