রমজানে ভেজালমুক্ত মুড়ির চাহিদায় ব্যস্ত ঈশ্বরদীর নারীরা

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ২১:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আলমাস আলী, ঈশ্বরদী (পাবনা)

রমজানে ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে মুড়ি। হাতে মুড়ি ভাজার প্রচলন কালের বিবর্তনে নেই বললেই চলে। এখন যন্ত্রের মাধ্যমে নানা রকম রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হয় প্যাকেটজাত মুড়ি। জৈব সারে উৎপাদিত ধান দিয়ে ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের মুড়ির কথা এই ভেজালের যুগে কল্পনাই করা যায় না।

তখন ঈশ্বরদীর ৭টি গ্রামে ৩০ বছর ধরে শতভাগ নিরাপদ হাঁড়িতে হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি করে আসছেন শত শত মুড়ি কন্যারা।

শুধু ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের মুলাডুলি, হাজারীপাড়া, শেখপাড়া, দাশুড়িয়া, খয়েবাড়িয়া, মার্মী ও সুলতানপুর গ্রামের নারীদের হাতে ভাজা মুড়ির কারণেই গ্রামগুলোর পরিচিতি হয়েছে ‘মুড়িগ্রাম’ হিসেবে। এখানকার এসব গ্রামের উৎপাদিত মুড়ি ঈশ্বরদী ও আশপাশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রামের বড় বড় সুপারশপে।

এই নিরাপদ মুড়ি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৮০ টাকা দরে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে এই মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা দরে।

ঈশ্বরদীর নিরাপদ মুড়ির সুখ্যাতি ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের উন্নত অনেক দেশে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, ইউরোপ, আমেরিকা ও পাশ্চাত্যে যাচ্ছে ঈশ্বরদীর মুলাডুলির মুড়ি।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে সরেজমিনে ঈশ্বরদী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মুলাডুলির অজগ্রাম হাজারীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মুড়ি নিয়ে নারীদের ব্যস্ততা। কেউ ধান সেদ্ধ করছেন, কেউ শুকাচ্ছেন, কেউ মাটির বিশেষ হাঁড়িতে বালু গরম করছেন, পাশাপাশি চাউলে পানি মিশিয়ে মুড়ি বানানোর জন্য প্রস্তুত করছেন।

জানা গেছে, ভেজালের ভিড়ে সবাই এখন একটু ভেজালমুক্ত খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত। তখন পবিত্র রমজান মাসে ঈশ্বরদীতে নিরাপদ মুড়িতেই ভরসা খুঁজে পেয়েছেন এই এলাকার মানুষ। বাজারের যান্ত্রিক উপায়ে তৈরি সাধারণ মুড়ির চেয়ে দাম একটু বেশি হলেও এই নিরাপদ মুড়িতেই ভরসা রাখছেন রোজাদাররা।

প্রতি বছরের মতো এবারও ঈশ্বরদীর ‘মুড়িগ্রাম’ খ্যাত মুলাডুলি গ্রামের মুড়ি কন্যারাও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত মুড়ি তৈরির কর্মযজ্ঞে।

রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় অপরিহার্য অনুষঙ্গ মুড়ি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া শুধুমাত্র জৈব সারে উৎপাদিত ধান থেকে ঢেঁকি ছাঁটা চালে তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ভাজা মুড়ির সুখ্যাতির কারণে ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম ‘মুড়িগ্রাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ঈশ্বরদী থেকে নিয়মিতভাবে এসব মুড়ির চালান যাচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে।

ভেজালমুক্তভাবে এই মুড়ি তৈরির জন্য গ্রামের নারীদের সহযোগিতা করছে উবিনীগ ও নয়া কৃষি আন্দোলন নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন এসব এলাকায় প্রায় ২৫ মণ নিরাপদ মুড়ি তৈরি হয়। বাজারে যেসব সাধারণ মুড়ি পাওয়া যায়, তার চেয়ে এই মুড়ি দেখতে যেমন আলাদা, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্য শতভাগ নিরাপদ। প্রতিবছর চট্টগ্রামের নন্দনকান, ঢাকার মোহাম্মদপুরের শস্য প্রবর্তনা, বসুন্ধরা সিটির বনানীতেও এই মুড়ি বিক্রি হয়।

হাজারীপাড়া গ্রামের মধ্যবয়সী নারী জাহেদা বেগম বলেন, তাদের জমিতে আউশ ও আমন জাতের ধান উৎপাদনে নিজের তৈরি জৈব সার ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, “আমি এখানে ৩০ বছর ধরে মুড়ি ভাজছি। শুধু মুড়ি ভাজার কাজ করে প্রতি মাসে আয় করি ১৫ হাজার টাকা।”

একই গ্রামের সাহেদা বেগম ও আয়েশা বেগম জানান, সারাদিন চুলার আগুনের তাপ সহ্য করে মুড়ি ভাজেন। কষ্ট হলেও দিন শেষে ভালো কাজ ও ভালো আয় হওয়ায় সব কষ্ট ভুলে যান। রাসায়নিক সারমুক্ত চাউলে নিরাপদ মুড়ি উৎপাদন করে তারা এক ধরনের সুখ অনুভব করেন।

মুলাডুলির সানোয়ার হোসেন বলেন, প্রতি বছর মুড়ির চাহিদা বাড়ছে। শুধু আমাদের চাতালেই প্রতিদিন প্রায় আড়াই মণ মুড়ি ভাজা হয়।

তিনি জানান, সারা বছর উপজেলার মুলাডুলি, হাজারীপাড়া, শেখপাড়া, দাশুড়িয়া, খয়েবাড়িয়া, মার্মী ও সুলতানপুর গ্রামের শতাধিক নারী তাদের বাড়িতে মুড়ি ভাজেন। তবে রমজান এলে মুড়ির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। রমজানের গুরু থেকে এক স্থান থেকেই দুই হাজার ৮০০ কেজি মুড়ি বিক্রি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

উবিনীগের ঈশ্বরদী আঞ্চলিক অফিসের সমন্বয়কারী আজমিরা খাতুন জানান, ঈশ্বরদীর মুলাডুলি, হাজারীপাড়া, শেখপাড়া, দাশুড়িয়া, খয়েবাড়িয়া, মার্মী ও সুলতানপুর গ্রামের কয়েকশ নারী এই মুড়ি তৈরি করছেন।

তিনি জানান, সার ও কীটনাশকমুক্ত ঢেঁকি ছাঁটা চাল দিয়ে গ্রামের এসব নারীরা শুধুমাত্র লবণ ও পানি ছাড়া অন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার করেন না। এই মুড়ির নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিরাপদ মুড়ি’। প্রতিদিন এসব এলাকায় প্রায় ২৫ মণ মুড়ি তৈরি হয়।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, ভেজালের যুগে ঈশ্বরদীতে এই নিরাপদ মুড়ি তৈরি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। এই নিরাপদ মুড়ির সঙ্গে মুলাডুলির কয়েক শত নারী জড়িত রয়েছেন। নিরাপদ মুড়ি ভাজার কারণে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।