চুয়াডাঙ্গায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ লাইন

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৫:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

  শরীফ উদ্দীন, চুয়াডাঙ্গা

চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ তলানিতে নামায় জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন এখন প্রায় তেলশূন্য। মাঝে মাঝে ডিপো থেকে সীমিত পরিমাণ তেল আসছে, যা গ্রাহকদের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যানবাহন চালক ও কৃষকরা। এদিকে দিনের বেশিরভাগ পাম্পে তেল নেই বলে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড করে রাখা হচ্ছে পাম্পগুলো। চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন পাম্পে দেখা গেছে ক্রেতাদের লম্বা লাইন।

পাম্প মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। চুয়াডাঙ্গা জেলার পাম্পগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে চাহিদামতো তেলের বরাদ্দ মিলছে না। তেলবাহী লরিগুলো ডিপো থেকে সীমিত পরিমাণ তেল নিয়ে ফিরছে, যা বরাদ্দের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পের সামনে ‘তেল নেই’ লেখা সংবলিত বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। যে কয়েকটি পাম্পে তেল অবশিষ্ট আছে, সেখানেও জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২০০-৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। তেলের আশায় পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন মোটরসাইকেল ও ট্রাক চালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও অনেকে তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

অনেকে আবার তেলশূন্য বাইক রাস্তায় রেখে বোতল হাতে পাম্পে ছুটে আসছেন তেল পাওয়ার আশায়। কিন্তু পাম্পে এসে দেখতে পাচ্ছেন ভিন্ন চিত্র—লম্বা লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতারা। কিছু কিছু জায়গায় তেল পাওয়া গেলেও সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে তেল বিক্রি করছে।

চুয়াডাঙ্গা মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। বর্তমানে সেচ মৌসুম চলায় ডিজেলের চাহিদা তুঙ্গে। তেল না পাওয়ায় সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বোরো আবাদে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। অন্যদিকে, পরিবহন চালকদের অভিযোগ—তেল সংকটের অজুহাতে কোনো কোনো জায়গায় চড়া দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গার মেসার্স মোজাম্মেল হক পেট্রোল পাম্পের ক্যাশিয়ার মামুন হোসেন জানান, গতকাল ৩ হাজার লিটার পেট্রোল, ৩ হাজার লিটার অকটেন এবং সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল এসেছিল। রাত থেকে বিক্রি শুরু হয়ে বেলা আড়াইটার মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়। দিনরাত ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।

তিনি বলেন, “ডিপো থেকে তেল না এলে আমরা দেব কোথা থেকে? মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে আমদানি কম হচ্ছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। আবার রিকুইজিশন দেওয়া হয়েছে, আজ রাত বারোটার মধ্যে তেল আসবে বলে আশা করছি।”

তেল কিনতে আসা ক্রেতা আসাদুর রহমান বলেন, “সারাদিনে অন্তত চারটি পাম্প ঘুরেছি, কোথাও তেল পাইনি। বাইকে যে পরিমাণ তেল আছে তা দিয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়। কয়েকটি পাম্পে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় সেখান থেকেও তেল নিতে পারিনি। এভাবে চললে আমরা বিপদে পড়ব।”

চুয়াডাঙ্গার মেসার্স হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জাকিরুল ইসলাম বলেন, পাম্পে বর্তমানে পেট্রোল ও অকটেন নেই। গতকাল আড়াই হাজার লিটার পেট্রোল ও ৬ হাজার লিটার ডিজেল এসেছিল, যা রাত দুইটা থেকে বেলা সাড়ে বারোটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়।

তিনি জানান, “ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। আজ রাতে ৯ হাজার লিটার ডিজেল, ৩ হাজার লিটার পেট্রোল ও ৩ হাজার লিটার অকটেন আসার কথা রয়েছে।”

চুয়াডাঙ্গা টার্মিনালের মামুন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে দেখা যায়, বিকালে সীমিত পরিমাণ পেট্রোল বিক্রি করা হচ্ছে। তেলের সংকট থাকায় ক্রেতাদের ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে তেল দেওয়া হচ্ছে। তেল বিক্রির সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।

এ সময় এএসআই বাবুল হোসেন বলেন, “সকল ক্রেতা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।”

সরকারিভাবে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি ত্বরান্বিত না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।