দৌলতদিয়ায় বাসডুবি: ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার, হস্তান্তর ২৫

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১৫:০১ | অনলাইন সংস্করণ

  রাজবাড়ী প্রতিনিধি

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক বাসডুবির ঘটনায় সর্বশেষ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন। ১১ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এছাড়াও এখনও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৪ জন পুরুষ শিশু, ৩ জন কন্যাশিশু, ১১ জন নারী এবং ৮ জন পুরুষ রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকার ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাজবাড়ী শহরের লালমিয়া সড়ক, সজ্জনকান্দা ও দাদশী ইউনিয়নের কয়েকটি পরিবারে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা এই দুর্ঘটনাকে আরও বেদনাবিধুর করে তুলেছে।

নিহতরা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ড মজমপুর এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাগড়বাড়ীয়া এলাকার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দা এলাকার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), একই এলাকার কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০), গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়ন চর বারকিপাড়া এলাকার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), গোয়ালন্দ উপজেলার রেজাউল করিমের মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বিল্লাল হোসেনের ছেলে ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী পৌরসভার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১) (বাসচালক), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০), রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর এলাকার সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), একই এলাকার মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোপালগঞ্জ জেলার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকার আশুলিয়া এলাকার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নুরুজ্জামানের ছেলে শিশু আরমান (৭ মাস), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), রাজবাড়ী সদর উপজেলার ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ (৫০), একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল (২৪) এবং বোয়ালিয়া এলাকার মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর (৫৫)।

এর আগে, বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পন্টুন হয়ে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলটি গভীর হওয়ায় উদ্ধারকাজে শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়।

ঘটনার পরপরই দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে অবস্থানরত উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে ঝড়ো বৃষ্টির কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পুনরায় অভিযান শুরু হয়।

দীর্ঘ প্রায় ৭ ঘণ্টার অভিযানে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হয়। ওই সময় নারী ও শিশুসহ ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বেলা ২টা পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল ও বাড়িঘরগুলোতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন তারা।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস, জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা সাকিব হোসেন, আব্দুল আজিজ, দেলোয়ার হোসেন ও শিশু আলিফ জানান, বাসটিতে নারী-শিশুসহ প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন। পন্টুনে ওঠার আগে কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের মধ্যেই ছিলেন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় ৮ থেকে ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

স্থানীয়দের দাবি, এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এ সময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এমপি বলেন, সহায়তা দিয়ে তো আর মানুষকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। যার যায়, সেই বোঝে। আমরা লাশগুলো দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিজনকে ২৫ হাজার টাকা করে এবং আহতদের প্রতিজনকে চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। যারা আমাদের ছেড়ে গেছে, তাদের সংখ্যা নিরূপণ শেষে পরিবারকে স্থায়ী পুনর্বাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একজনের মরদেহ নিখোঁজ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, অতিরিক্ত গতির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে ডুবুরি দল ও উদ্ধারকারী জাহাজ কাজ করছে এবং ঢাকা থেকে আরও ডুবুরি দল আসছে। উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বেলা ২টায় ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, এখন পর্যন্ত মোট শিশু, নারী ও পুরুষসহ ২৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত নিখোঁজ একজনেরও স্বজন মরদেহ খুঁজবে, ততক্ষণ আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমাদের ৫টি ইউনিট এ অভিযান পরিচালনা করছে।