ফের পেছাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিকে জ্বালানি লোডিং
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৬ | অনলাইন সংস্করণ
আলমাস আলী, ঈশ্বরদী (পাবনা)

লাইসেন্স না পাওয়ায় আগামী ৭ এপ্রিল নির্ধারিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অগ্নি নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে এখনো জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ)। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়ের নানা জটিলতা পেরিয়ে এখন দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগেও একাধিকবার উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়েছে। প্রায় দুই বছর আগে রাশিয়া থেকে প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি দেশে আনা হলেও তা এখনো ব্যবহার করা যায়নি।
গত ১৫ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক পত্রে জানানো হয়, ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন করা হবে। এতে ভার্চুয়ালি অংশ নেওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের।
জ্বালানি লোডিংয়ের আগে International Atomic Energy Agency-এর তত্ত্বাবধানে Bangladesh Atomic Energy Regulatory Authority থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, “সবকিছু ঠিক থাকলেও কিছু ক্রিটিক্যাল ইস্যু সামনে এসেছে। সেগুলো সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। খুব বেশি নয়, অল্প কিছুদিনের জন্য জ্বালানি লোডিং পিছিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য-আমরা জান দিয়ে চেষ্টা করছি। এজন্য আমরা মসজিদ-মন্দির-উপসনালয়েও সকলকে প্রার্থনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করছি। “সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, এর আগে নভেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট সম্পন্ন হয়। ফিজিক্যাল স্টার্ট আপের (জ্বালানি লোডিং) প্রস্তুতির সামগ্রিক অবস্থা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA), রাশিয়ার শিল্প ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা তদারকি সংক্রান্ত সংস্থাভিও সেফটি তিনটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল গত ৭ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এসময় ২৫৭টি অবজারভেশন চিহ্নিত করা হয়। এসকল অবজারভেশনের মধ্যে ফের কিছু ক্ষেত্রে পুনঃপরীক্ষা এবং অতিরিক্ত কিছু এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি আমরা জ্বালানি লোডিং এর লাইসেন্স পেয়ে যাব।
প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন বলেন, “জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব নথি আমরা জমা দিয়েছি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএইআরএ’র আরও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। বিশেষ করে ফায়ার ফাইটিং ও ফায়ার সেফটি সিস্টেম নিয়ে কিছু কাজ বাকি আছে। এসব সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।”
তিনি আরও জানান, ফায়ার সার্ভিস বিভাগ থেকে পুনরায় পরিদর্শন করা হবে। এরপর লাইসেন্স পাওয়া গেলে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
জ্বালানি লোডিং এর লাইসেন্স পাবার আগে দুই দেশের (বাংলাদেশ ও রাশিয়া) সরকার প্রধানের সময় নিয়ে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করায় অস্বস্তিতে পড়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার ( ৩১ মার্চ ) মাঝ রাত পর্যন্ত বৈঠক চলে বিজ্ঞান ভবনে। পরে জানানো হয়, পেছানো হচ্ছে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের তারিখ।
এদিকে, প্রকল্পের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান Rosatom-এর একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। আরও কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি আসার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প উৎস হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে নির্মিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা)। ২০১৩ সালে চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ চলমান, যা আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ হতে পারে। পুরো প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে, প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
