রমেক হাসপাতালের আইসিইউতে এক মাসে ২৭ জনের মৃত্যু

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এ শয্যা সংকট পার করছে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (রমেক)। হাসপাতালটি বিভাগের আট জেলার মানুষের চিকিৎসায় ভরসা হলেও গুরুতর রোগীদের জন্য সেখানকার আইসিইউতে রয়েছে মাত্র ১০টি শয্যা। শয্যা সংকট ছাড়াও রমেকের আইসিইউতে রয়েছে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৩০ দিনে আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৫৮ জন রোগীর মধ্যে ২৭ জনেরই মৃত্যু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে আইসিইউতে পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়ার ঘটনাই এসব মৃত্যুর পেছনে বড় কারণ। বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০ জন রোগী, যাদের বেশিরভাগই সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। এসব রোগীর অধিকাংশই স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাইফুল ইসলামের স্ত্রী আরজিনা বেগম জানান, ২৪ দিন ধরে তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। অনেক চেষ্টার পর তাকে আইসিইউতে ভর্তি করাতে পেরেছেন তিনি।

আরেক রোগীর স্বজন সোনালী বেগম বলেন, ‘আইসিইউতে শয্যা পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

রোগীর এক স্বজন জয়নাল আহমেদ জানান, সরকারি হাসপাতাল ছাড়া বাইরে প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ পড়ছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। তবে সিরিয়াল পেতে পেতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এ জন্য অতিদ্রুত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শয্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু রোগীর এত বিশাল চাপ সামাল দেওয়ার মতো আইসিইউ সুবিধা এখানে নেই। ফলে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। রোগীর এক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছয় মাস আগে আইসিইউর জন্য চেষ্টা করেও পাইনি। এখন আবার একই অবস্থা। টাকার অভাবে প্রাইভেট হাসপাতালে নিতে পারছি না। তাহলে আমরা যাব কোথায়?’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই আইসিইউর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সীমিত শয্যা ও যন্ত্রপাতির কারণে অনেক রোগীকেই ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গুরুতর রোগীরা প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবার এমন সংকট অগ্রহণযোগ্য। শুধু শয্যা বাড়ানোই নয়, আধুনিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ভেন্টিলেটর, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যেখানে খরচ বহন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত আইসিইউ ইউনিট সম্প্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।

ওই বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৩০ দিনে ভর্তি ৫৮ জনের মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু—এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের ভরসা রমেক হাসপাতাল। অথচ আইসিইউ সীমাবদ্ধ মাত্র ১০টি শয্যায়। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র হবে—এবং জীবন-মৃত্যুর এই লড়াইয়ে হারতে থাকবে আরও অনেক মানুষ।

রমেকের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আলফে সানি মৌদুদ আহমেদ বলেন, ‘আইসিইউতেই যদি এত রোগী মারা যায়, তাহলে বাইরে কতজন মারা যাচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রতিদিনের আড়াই থেকে তিন হাজার রোগীর অন্তত ১০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন। সে হিসেবে এখানে অন্তত ১০০টি আইসিইউ শয্যা থাকা প্রয়োজন।’

ডা. আলফে আরও বলেন, ‘বর্তমানে মাত্র ১০টি শয্যা দিয়ে আমরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’

এ ব্যাপারে রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সীমিত সম্পদ নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আইসিইউতে শয্যা বাড়ানোর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধানের আশায় আছি।’