পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেল গৃহবধূর, অনিশ্চয়তায় ৬ সন্তান

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১২ | অনলাইন সংস্করণ

  নওগাঁ প্রতিনিধি

ফাঁকা বাড়ি, নেই কোনো বেষ্টনি। উঠোনের দুই পাশে দুটি চুলা এখনো পড়ে আছে। কয়েক দিন ধরে বাড়িতে শুনশান নীরবতা। সন্ধ্যায় বাড়িতে বাতি জ্বালানোর মতো কেউ নেই। ঘরে ঝুলছে তালা। গত বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে বাড়িতে স্বামীর মারধরে মারা যান এ বাড়ির কর্ত্রী, ছয় সন্তানের জননী মরজিনা খাতুন। ঘটনার পর স্থানীয়রা স্বামী আব্দুল মকিমকে (৪০) আটক করে পুলিশে দেয়।

ঘটনার পর থেকে অবুঝ ছয় শিশু এখন দরিদ্র নানা-নানীর আশ্রয়ে রয়েছে। নাতি-নাতনিদের নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা। তাদের লেখাপড়া ও মানুষ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নানা-নানী।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে নওগাঁর পোরশা উপজেলার শীতলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের দিনমজুর আব্দুল মকিমের সঙ্গে পারিবারিকভাবে পাশের নীতপুর গ্রামের মশিউর রহমানের মেয়ে মরজিনা খাতুন রুপসির (২৬) বিয়ে হয়। দরিদ্র এ দম্পতির ছয় সন্তান। ছেলে সন্তানের আশায় একের পর এক চার মেয়ে জন্ম নেয়। পঞ্চম সন্তান ছেলে, এরপর আরও এক মেয়ে সন্তান জন্ম হয়।

নিজেদের আধাপাকা ছোট দুই কক্ষের ঘর ছাড়া তাদের কোনো সম্পত্তি নেই। মকিম কৃষিকাজ করতেন এবং মরজিনা প্রতিবেশীদের গরুর দুধ দোহন ও বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন।

এছাড়া প্রতিবেশীরাও বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতা করতেন। তাদের বাড়ি জেলার প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী শীতলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে।

সবার বড় মেয়ে মাহিয়া আক্তার মিমি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় মেয়ে মারিয়া আক্তার চতুর্থ শ্রেণি, তৃতীয় মেয়ে শ্রাবনি আক্তার তৃতীয় শ্রেণি এবং চতুর্থ মেয়ে জান্নাতুন শিশু শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এছাড়া পঞ্চম সন্তান রমজান আলীর বয়স ৪ বছর এবং ষষ্ঠ সন্তান জাইদাতুনের বয়স ১১ মাস।

ঘটনার দিন দুপুরে গমের ক্ষেতে কাজ করে স্বামী মকিম খাবারের জন্য বাড়ি আসেন। তিনি ফ্রিজ থেকে একটি ডিম বের করে ভাঙেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ক্ষোভের বসে মকিম প্রেশার কুকার দিয়ে মরজিনার মাথা ও মুখমণ্ডলে আঘাত করেন। এতে রক্তাক্ত জখম হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন মরজিনা।

বাচ্চাদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে স্থানীয়রা মকিমকে আটক করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। পরে থানা পুলিশের কাছে তাকে সোপর্দ করা হয়। ঘটনার পর নিহতের ছয় সন্তান তাদের নানা-নানীর কাছে আশ্রয় নেয়। মায়ের অনুপস্থিতি টের পেয়ে সন্তানরা কান্না করছে এবং অসহায় বোধ করছে।

নিহত মরজিনার প্রতিবেশী আলেয়া বেগম বলেন, আব্দুল মকিমের মাথায় একটু সমস্যা আছে। তারপরও সে পরিশ্রম করত। আর মরজিনা খুবই পরিশ্রমী একজন নারী ছিল। তার কারণেই সংসারটি টিকে ছিল। আমরা প্রতিবেশীরা তাদের সহযোগিতা করতাম। মেয়ে সন্তান জন্ম হওয়ার কারণে একসময় মরজিনাকে নির্যাতনও করা হয়েছিল। ছেলে-মেয়েরা এখন নানার বাড়িতে আছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

দরিদ্র বৃদ্ধ মশিউর রহমান ও তার স্ত্রী বর্তমানে ছোট ছেলের কাছে থাকা-খাওয়া করেন। তার ওপর আরও ছয় নাতি-নাতনি যোগ হয়েছে। তাদের নিয়ে এখন দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন তারা। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন নানী শওকত আরা।

নানী শওকত আরা বলেন, পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে—সবাই ছোট। মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি, কিভাবে তাদের মানুষ করব।

নানা মশিউর রহমান বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বয়স হয়েছে, কোনো কাজ করতে পারি না। কষ্ট করে ছোট ছেলের সংসারে চলি। তার ওপর আরও ছয়জনের দায়িত্ব পড়েছে। এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি। সমাজের বিত্তবানরা সাহায্য করলে তাদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করতে পারতাম।

পোরশা নীতপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাকিম বলেন, বৃদ্ধ মশিউর রহমান দরিদ্র মানুষ। তার ওপর ছয় শিশুর দায়িত্ব পড়েছে। এটি তার জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা এলে তাদের সহযোগিতা করা হবে। এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য সমাজে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।