ঈশ্বরদীতে ‘মধু বিপ্লব’, উৎপাদনে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

পাবনার ঈশ্বরদীতে বসন্তের শেষ সময়ে উপজেলা সলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী ও দাশুড়িয়া ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে যতদূর চোখ যায়, মাঠের পর মাঠ সবুজ পাতার মধ্যে সোনারঙা ফুল আর মুকুলে ছেয়ে গিয়ে এখন গুটি তৈরি হওয়াতে রূপ নিচ্ছে লিচু বাগানগুলো। লিচু গাছের নিচে থরে থরে মৌ বাক্স সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটি মৌ বাক্সে হাজারো মৌমাছির গুঞ্জন। কৃষকের পরিচর্যার সাথে মৌয়ালদের ব্যস্ততা বেড়েছে।
ঈশ্বরদী উপজেলায় বর্তমানে তিন প্রজাতির লিচুর আবাদ হচ্ছে। মোজাফ্ফর বা দেশি এবং বোম্বাই আর লিচু চায়না-৩। চলতি মৌসুমে লিচুর মুকুল থেকে রেকর্ড পরিমাণ মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৌসুমী মধু চাষীদের সূত্রে জানা গেছে, কেবল চলতি মৌসুমেই এ অঞ্চল থেকে মধু সংগ্রহের রেকর্ড ভঙ্গ করে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৪ মেট্টিক টন। যা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রমতে, চলতি মৌসুমে লিচুর ফুল থেকে মধু চাষের আওতায় থাকা মোট জমির পরিমাণ ছিলো ১৫৭৫ হেক্টর।
বিস্তৃত এই বাগানগুলোতে ব্যবহৃত মোট মৌমাছির বাক্সের সংখ্যা ছিল ১২৩১০ টি। আর এসব বাক্স থেকে এবছরের চলতি মৌসুমে মধু সংগ্রহ হয়েছে ২৩৪৬০ কেজি বা ২৩.৪৬ মেট্টিকটন। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭০ (সত্তর) লক্ষ ৩৮ (আত্রিশ) হাজার টাকা।
উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছোট বড় মোট লিচুর বাগান রয়েছে মোট ১১ হাজার ২৭০ টি। যা মৌসুমী মধু চাষীদের জন্য আদর্শ বাগান হিসেবে বহুল পরিচিত।
জয়নগর প্রামানিক পাড়া এলাকায় ৩০০ (তিনশত) বক্স নিয়ে ও ১ হাজার ৫০০ শত (পনের শত) ফ্রেম নিয়ে লিচুর মধু সংগ্রহকারী চাষী আমজাদ আলী বলেন, বছরের প্রায় ৭ মাস ধরে চলে মধু চাষের এই কর্মযজ্ঞ। আমার বাড়ি চাটমোহরে হলেও আমি মধু আহরণের এই মৌসুমে ঈশ্বরদীর লিচু বাগানগুলোতে আসি।
প্রতিটি বক্স থেকে ৬ থেকে ৭ দিন পর পর মধু সংগ্রহ করা যায়। তবে লিচু ফুলের মধু সংগ্রহ কাল থাকে সাধারণত ১ মাস। এবছর লিচু ফুলের থেকে মধু সংগ্রহের মৌসুম শেষের দিকে।
এই মধু সংগ্রহকারী আমজাদ আলী আরো বলেন, আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) অবধি আমার লিচু ফুলের মধু সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৩ টন। যার গড় বাজার মূল্য প্রায় ১০ (দশ) লক্ষ টাকা।
তবে লিচু ফুল বাদেও, আম, সরিষা, কালোজিরা, ধনিয়া, শিমুলসহ আরও কিছু ফুল রয়েছে সেগুলো থেকেও বছরের এই সাতমাস ধরে মধু সংগ্রহ করা হয়। তবে বাকী সময়গুলোতে প্রকৃতিতে কোন ফুল না থাকায় মৌমাছিগুলোকে তৈরি খাবার প্রদানের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে হয় বলেও জানান এই মধু চাষী আমজাদ আলী।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, এবছর ঈশ্বরদীতে আম এবং লিচুর মুকুল এসেছে রেকর্ড পরিমাণ। তাই বেশি ফুল থেকে বেশি মধু আহরণ সম্ভব হয়েছে। ঈশ্বরদীর স্থানীয় ১০ থেকে ১২ জন মৌচাষী রয়েছেন। তবে এবছর তাদের বাইরেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মধু আহরণের জন্য অনেক চাষী এসেছেন অত্রাঞ্চলে।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীতে লিচুর ফুল থেকে মধু চাষের আওতায় ছিলো ১৫৭৫ হেক্টর জমি। মোট মৌমাছির বাক্সের সংখ্যা ছিল ১২৩১০ টি। এখন পর্যন্ত মধু সংগ্রহ হয়েছে ২৩৪৬০ কেজি বা ২৩.৪৬ মেট্টিকটন। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭০ (সত্তর) লক্ষ ৩৮ (আত্রিশ) হাজার টাকা। যা এ যাবৎ কালের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ মধু আহরণ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, লিচু ফুল ও মুকুলে মৌমাছি বসলে পরাগায়ন ভালো হয়, রোগবালাইও অনেকটা কম হয়। সে ক্ষেত্রে অনেক বাগানে গুটি আসার পর কীটনাশক দরকার হয় না। এতে ঐ লিচু বাগানে বাম্পার ফলন হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকে। কীটনাশকের খরচটা কম হয়। এতে লিচুর যেমন বাম্পার ফলন হয়, তেমনি মধুও উৎপাদন হয় ভালো।
