রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু ২৮ এপ্রিল

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আলমাস আলী, ঈশ্বরদী (পাবনা)

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগামী ২৮ এপ্রিল জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে।

শুক্রবার বিকেলে এ তথ্য জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।

তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা ও রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা কমিশনিংয়ের পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

তিনি আরও জানান, “প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে এবং ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো হবে।”

এর আগে, লাইসেন্স না পাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল নির্ধারিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, ৭ এপ্রিল উদ্বোধনের জন্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু ক্রিটিক্যাল ইস্যু সামনে আসে। সেগুলো সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়। এখন পজিশন ভালো। সেজন্য প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের (কমিশনিং) বিষয়ে আমরা এখন সবাই একমত হওয়ায় গত ১৬ এপ্রিল লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান বলেন, “কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বিশেষজ্ঞ সফলভাবে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। লিখিত, মৌখিক (ভাইভা) এবং সিমুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে তারা এই লাইসেন্স পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পরীক্ষা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করেছে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা রোস্টেকনাডজর, রাশিয়ার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠান ভিও-সেফটি, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)-এর বিশেষজ্ঞরা। এই ৫২ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ এবং রাশিয়ার লাইসেন্সধারী অপারেটরদের সমন্বয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হবে।”

তিনি জানান, “জ্বালানি লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ফাইনাল সেফটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট প্রস্তুত করা হবে। কমিশনিং ধাপটি অত্যন্ত কঠোর ও চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। সব প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাস সময় লাগবে।”

ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতি হিসেবে যে পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়েছে, তাতে এনপিসিবিএল-এর অপারেটররা রাশিয়ার অপারেটরদের সঙ্গে যৌথভাবে সফলভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। এই সাফল্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রটি চালু হলে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট কমাতে সাহায্য করবে এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

প্রসঙ্গত, পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটি মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করবে।