কিশোরগঞ্জ হাওরে ৪৮ শতাংশ ধান কাটা শেষ, বন্যার শঙ্কা
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:২০ | অনলাইন সংস্করণ
শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গতকাল (রবিবার) পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। আজও সকাল থেকে ধান কাটা অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া বৈরী না হলে আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে সম্পূর্ণ ধান কাটা শেষ হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে, আগাম বন্যার পূর্বাভাস থাকায় কৃষকদেরকে ৮০ শতাংশ পাকলেই ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
এদিকে, ফলন ভালো হলেও বাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কম থাকার অভিযোগ কৃষকদের। প্রতি মণ নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়।
এছাড়াও, চলতি মৌসুমে ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় বাড়তি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন খরচে, এমনটিও বলছেন কৃষকেরা।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আগাম বন্যার শঙ্কায় রোদের প্রখর তাপ উপেক্ষা করেই ধান কাটায় ব্যস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। জেলার ১ হাজার ৪৭০ বর্গকিলোমিটার দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের সকল কৃষক এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন বোরো ধানকে ঘিরে। এ অঞ্চলে এবার বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে।
হাওরের যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই এখন সোনারঙের ঝিলিক। চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এসব ধান কাটাই-মাড়াই-ঝাড়াই করে ঘরে তোলার জন্য কৃষকের পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন কৃষাণীরাও। তবে, নতুন ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বিষয় নিয়ে অভিযোগ কৃষকদের।
জেলার ইটনা উপজেলার কুনিয়ার হাওরের কৃষক জামাল মিয়া বলেন, ‘এ বছর গত বছরের তুলনায় ধান অনেক ভালো হয়েছে, এতে আমরা অত্যন্ত খুশি হতাম। কিন্তু এ বছর আমরা ডিজেলের সমস্যাটায় খুব ভুগছি। একদিকে ডিজেলের দাম বেশি, পর্যাপ্ত পাওয়াও যাচ্ছে না। ধান কাটা থেকে মাড়াই—সব কাজেই এখন যন্ত্র ব্যবহার করি আমরা। এসব যন্ত্র ডিজেল ছাড়া চলে না। এখন আগাম বন্যার আগে ধান যাতে ঘরে তুলতে পারি, সে চেষ্টাই করছি আমরা।’
নিকলি হাওরের কৃষক খালেক মিয়া বলেন, ‘এক মণ ধান উৎপাদন করতে ১১০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বিক্রি করছি ৭০০-৮০০ টাকা মণ। এর পরেও ব্যাপারী পাই না। ধানের দাম না বাড়লে আমরা কৃষক মারা যাবো।’
পাকা ধান দ্রুত কাটতে ব্যবহার হচ্ছে কম্বাইন্ড হারভেস্টার, যা দিয়ে দ্রুত সময়ে জমি থেকে ধান কাটাই-মাড়াই করে বস্তাবন্দি করে ঘরে তুলতে পারছেন কৃষক। তবে, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মেশিন ভাড়ায় গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচে। এবার শ্রমিক মজুরিও বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন কৃষকেরা।
নিকলি ছাতিরচর হাওরের কৃষক আলম মিয়া বলেন, ‘গেল বছরের চেয়ে প্রতি একরে ২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে মেশিনে ধান কাটাচ্ছি। মেশিনের মালিকরা বলছে ডিজেলের দাম বেড়েছে, তাই বাড়তি টাকা দিতে হবে। এখন তাড়াতাড়ি যাতে ধান ঘরে তুলতে পারি, সেজন্য বেশি টাকায়ই কাটাচ্ছি।’
মিঠামইন হাওরের কৃষক আনিসুর রহমান বলেন, ‘এবার ধান কাটাতে মজুরি প্রতি জনে ১১০০-১২০০ টাকা। ডিজেলের প্রচুর দাম, কীটনাশকেরও অনেক দাম। সব মিলিয়ে ধান উৎপাদনে অনেক খরচ। এখন ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকা মণ। আমরা বেহাল অবস্থায় আছি। এটার সমাধান হলে আমরা উপকৃত হবো।’
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মে মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে হাওরাঞ্চলের সমস্ত ধান কর্তন হয়ে যাবে। কৃষি বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে, যেন ৮০ শতাংশ পাকলেই ধান কর্তন করে ফেলে। আমরা আবহাওয়ার একটি পূর্বাভাস পেয়েছি যে, ভারী বর্ষণ থেকে আগাম বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে। আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য ৮০ শতাংশ পাকা ধান কাটার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছি এবং কৃষকগণও তৎপর আছে। আশা করছি ফসলের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে না। আবহাওয়া বৈরী না হলে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’
চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন।
