রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কমিশন গঠনের দাবি
ক্যাম্পে স্থায়ী শেল্টার নির্মাণ জনমতের বিরুদ্ধে
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ২০:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ
কক্সবাজার অফিস

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে একটি ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিও নেতারা।
সোমবার (১১ মে) কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত ‘কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনটি পরিচালনা করেন সিসিএনএফের কো-চেয়ার রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। আসিয়ান ফোরামে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং চাপ প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরাকান আর্মিদের সঙ্গে আলোচনায় বসারও আহ্বান জানাচ্ছি।
রেজাউল করিম চৌধুরী কক্সবাজারের সমসাময়িক ইস্যু, রোহিঙ্গা সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য কক্সবাজারের সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে একশন এইড, টিডিএইচ ও এক্টেডের নাম উল্লেখ করা হয়।
বক্তাদের দাবি, এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার নিজ নিজ দেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে কাজ করার কথা। তারা জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর এই কার্যক্রমের তীব্র বিরোধিতা করেন।
সিসিএনএফের সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে। যা স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। নির্মাণে ব্যবহৃত কিছু উপকরণ পরিবেশবান্ধব নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পৃথিবীর কোথাও শরণার্থীদের জন্য এমন স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির নেই। এটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আরও রোহিঙ্গার ঢল সামলাতে হতে পারে। তাই জনগণ ও স্থানীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিসিএনএফের সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য ১৫০ মিলিয়ন তহবিল দিয়েছে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ জাতিসংঘ এবং ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়েছে। অথচ স্থানীয়করণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই তহবিলের ২৫ শতাংশ সরাসরি স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে যাওয়ার কথা।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে এমন আইন করা উচিত। যাতে স্থানীয় এনজিও ছাড়া জাতিসংঘের কোনো সংস্থা কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারে। পাশাপাশি JRP স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য উন্মুক্ত করারও দাবি জানাচ্ছি।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ব্র্যাক স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য একটি পুল ফান্ড বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু সেখানে মাত্র ২২ শতাংশ স্থানীয় এনজিও এবং ৭৮ শতাংশ জাতীয় এনজিও তহবিল পাচ্ছে। অথচ এই তহবিল স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কর্মরত অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও ও জাতিসংঘ সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক। এটি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতেও প্রভাব ফেলতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বাংলাদেশি ও কক্সবাজারের সন্তানদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিইএইচআরডিএফের প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য ৮ হাজার একর বনভূমি নষ্ট করে ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে। এতে কক্সবাজারের পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহ এবং পুকুর খননের ওপর জোর দেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তানজির উদ্দিন রনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (RCT) স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তিনি সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জবাবদিহিমূলক একটি “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন” গঠনের দাবি জানান, যারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরবে।
কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ডের কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বলেন, ক্যাম্পে এনজিও সুশীলনের মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) রোহিঙ্গাদের ভেন্ডরশিপ প্রদান করে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি এ ধরনের কার্যক্রম সঠিকভাবে তদারকির দাবি জানান।
রাজাপালং ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলার উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে স্থানীয়দের ৩০০ একর আবাদি জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয় তুলে ধরা হলেও তা উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রশ্নোত্তর পর্বে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কী আলোচনা হচ্ছে বা কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তা স্থানীয়দের জানানো হয় না। তিনি বলেন, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই এবং প্রতিনিয়ত নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সাল থেকেই কক্সবাজার অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। সেনাবাহিনীর সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের সুস্পষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা নীতি ও পরিকল্পনা নেই বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
