পাবনায় চাহিদার দ্বিগুণ কোরবানির পশু, দাম নিয়ে শঙ্কায় খামারিরা

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১৯:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

  কাজী বাবলা, পাবনা

পাবনায় এবার পবিত্র ঈদুল আযহাকে (কোরবানি ঈদ) সামনে রেখে চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৩৩ হাজার ৪০টি খামারে এবার মোট ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি পশু। চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। তবে লাভের দেখা পাওয়া নিয়ে সন্দিহান তারা। মণ প্রতি ৩২-৩৪ হাজার টাকা দর না পেলে লোকসানে পড়তে হবে বলে দাবি করেছেন খামার মালিকগণ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জেলায় গরু প্রস্তুতের শেষ পর্যায়ে খামারিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ বছর দেশি ও সংকর প্রজাতির গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। নিয়মিত খাবার দেওয়া ও পরিচর্যায় এখন শেষ ভাগের ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। তবে এই ব্যস্ততার মাঝেও খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কয়েকজন খামারি জানান, গত দুই বছরে দানাদার গোখাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে এবার হাটে গরু পরিবহন খরচও বাড়বে। সে অনুপাতে পশুর দাম না বাড়ায় সারা বছরের খরচ সমন্বয় আর ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের লালচাঁদ মোল্লা নিজ বাড়িতে খামার স্থাপন করে পাঁচটি দেশি ষাঁড় লালন-পালন করছেন গত এক বছর ধরে। এই খামারের পাশাপাশি তিনি গরু ব্যবসার সাথেও জড়িত। ইতোমধ্যে কোরবানির বাজারে দেশের বিভিন্ন জেলার হাটগুলোতে গরু বেচাকেনা শুরু করেছেন তিনি।

বর্তমান বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে এক থেকে দেড় লাখ টাকার গরুপ্রতি বাজার কমেছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে। বর্তমানে ৪ মণ ওজনের একটি দেশি গরুর দাম যাচ্ছে এক লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো। এভাবে যদি দরপতন হয় তবে খামারিরা এবারও বিপদে পড়বে। আর যদি ভারতসহ দেশের বাইরের গরু বাজারে ঢোকে তাহলে একেবারে শেষ হয়ে যাবে খামারিরা। এদিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই খামারি ও গরু ব্যবসায়ী।

তিনি আরও বলেন, গত বছরের তুলনায় ৪০ কেজি ওজনের বস্তাপ্রতি গমের ভুসিতে ৩০০ টাকা, মসুরে ২০০ টাকা, অ্যাংকারে ২০০ টাকা ও ধানের গুড়ায় ৩০০ টাকা করে দাম বেড়েছে। ধানের শুকনা খড়ের দামও মণপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। এভাবে সব ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে। এক্ষেত্রে গরুতে মণপ্রতি ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। যারা খামারে লোক রেখে গরু পালন করেন তাদের খরচ আরও বেশি হয়েছে। এক্ষেত্রে মণপ্রতি দেশি গরুতে কমপক্ষে ৩৩-৩৪ হাজার টাকা দাম পেতে হবে। আর সংকর জাতের গরুগুলোর দাম হতে হবে প্রায় ৩২ হাজার টাকা। না হলে অধিকাংশ খামারি লোনও পরিশোধ করতে পারবে না।

পাবনা সদর উপজেলার দ্বীপচর এলাকার হামিদ ক্যাটল ফার্মের পরিচালক সিফাত রহমান বলেন, মূলত নিজেদের কোরবানির চাহিদা মেটানো ও শখের বসে শুরুতে খামার করি। কিন্তু এখন এর পরিসর বেড়েছে। এবার খামারে গরু আছে ১৮টি। আমাদের নিজস্ব মিল আছে, সেখান থেকে খাবারের সহায়তা পাই। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের দামে গরুকে অনেক খাদ্য খাওয়াতে পারছি। এক্ষেত্রে খাদ্যে খরচ কিছুটা কম। তবুও শ্রমসহ সব ব্যয় হিসাব করতে গিয়ে বছর শেষে দেখা যায় গায়ে গায়ে শোধ যাচ্ছে। দুই টাকা অতিরিক্তও থাকে না। যারা নিজেরা বাড়িতে দুই-একটি পালন করেন তাদের সামান্য কিছু লাভ থাকে। তবে তাদের শ্রম হিসাব করলে সেটিও থাকে না।

তিনি বলেন, অন্যান্য বছরগুলোতে এসময়ে খামারগুলোতে কোরবানির গরু কেনার জন্য অনেকের আনাগোনা দেখা যায়। অনেকে গরু ক্রয়ও করেন। কিন্তু এবার তেমনভাবে লোকজন দেখা যাচ্ছে না। একজন এসেছিল, সে ঘুরে ঘুরে দেখলেও কোনো দামই বললেন না। এবার বাজার নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে।

পাবনা সদর উপজেলার গয়েশপুরের খামারি বেলাল হাজি বলেন, বড় গরুতে লোকসানই বেশি হয়। এর আগে লোকসানে বেচতে হয়েছে। এবারও ২০ মণ ওজনের একটি গরু আছে। গত বছর ১৩ মণ ওজনে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনেছিলাম। এই গরুর পেছনে এক বছরে আমার খরচ গেছে ২ লাখের বেশি। এখনো কেউ দাম বলছে না। বাজারের অবস্থা আরও খারাপ হলে আমাদের বিপদ।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি পশুর চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ৩৩ হাজার ৪০টি খামারে কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫টি গরু ও ৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৭৭টি ছাগল রয়েছে। সব মিলিয়ে চাহিদার দ্বিগুণ উদ্বৃত্ত পশু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, খামারিদের স্বার্থ ও গরুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। ইতোমধ্যে বাইরের গরু যেন দেশে না ঢোকে সে বিষয়ে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার হাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি এবার বাইরের গরু বাজারে ঢুকবে না।

তিনি বলেন, বাইরের গরু না এলে খামারিরা সঠিক দামে লাভবান হবেন। খামারিদের সাথে আমি একমত পোষণ করছি। মণপ্রতি ৩২-৩৪ হাজার টাকা দাম পেলে খামারিরা লাভবান হবেন। আর নানা সংকটে গোখাদ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও এটি শিগগিরই কমে আসবে।