রূপপুরের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জনে লাগতে পারে ৩ থেকে ৫ বছর: এনপিসিবিএল এমডি
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ১৬:৪০ | অনলাইন সংস্করণ
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরঘেঁষা সবুজ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল নতুন এক যুগের সূচনার জন্য। গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরের কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশের মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে উন্মোচিত হয়েছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।
বাংলাদেশ এখন সময়ের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও বহু স্বপ্নের বাস্তব রূপ হিসেবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে গত ১২ মে প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত বিদ্যুৎ উৎপাদন।
রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক। প্রকল্পের শুরু থেকে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান।
রূপপুর প্রকল্পের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে তিনি যা বলেন, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
VVER-1200 প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত VVER-1200 হলো অত্যাধুনিক Generation III+ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি, যা রাশিয়ার Rosatom ডিজাইন করেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর সুপারিশ অনুযায়ী “Defence-in-Depth” নীতির ভিত্তিতে এতে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ প্রযুক্তিতে রয়েছে উন্নত Active Safety System, যেমন স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন ও Emergency Core Cooling System। পাশাপাশি রয়েছে Passive Safety System, যা বিদ্যুৎ বা মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই দীর্ঘ সময় রিঅ্যাক্টরকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম।
এ ছাড়া এতে যুক্ত করা হয়েছে Double Containment Structure, Core Catcher, Hydrogen Recombiner এবং একাধিক Redundant Safety System, যা পুরোনো প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।
বিশেষভাবে, ২০১১ সালের Fukushima Daiichi দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে VVER-1200 ডিজাইনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। ফলে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন (Station Blackout) অবস্থাতেও রিঅ্যাক্টর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠান্ডা রাখা, হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘ সময় নিরাপদ অবস্থা বজায় রাখা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা শর্ত পূরণে কী করা হয়েছে?
তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মূলত IAEA-এর Safety Standards অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Defence-in-Depth ব্যবস্থা, যেখানে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়।
এ ছাড়া তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সাইবার ও ফিজিক্যাল সিকিউরিটি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
রূপপুর প্রকল্পে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মান কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। ডিজাইন, নির্মাণ, ইনস্টলেশন, কমিশনিং ও প্রি-অপারেশনাল প্রতিটি ধাপেই IAEA-এর নির্দেশনা মেনে কাজ করা হয়েছে।
এ সময় IAEA-এর একাধিক আন্তর্জাতিক মিশন—যেমন Site Review, Safety Review এবং Operational Readiness Review—বাংলাদেশ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
তবে পারমাণবিক নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। অপারেশন শুরু হওয়ার পরও নিয়মিত পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ, আপডেট এবং Safety Culture উন্নয়নের কাজ অব্যাহত থাকবে।
নিরাপত্তা ও মনিটরিং ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে?
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে অত্যাধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও বহুস্তরভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে।
এই প্ল্যান্টে ৭ হাজারের বেশি Interlock এবং বিভিন্ন Safety Function সংযুক্ত রয়েছে। কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করবে।
মানবীয় ভুলের ঝুঁকি কমাতে অধিকাংশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হবে। এমনকি চরম পরিস্থিতিতে প্ল্যান্টে কোনো অপারেটর উপস্থিত না থাকলেও রিঅ্যাক্টর নিজেই নিরাপদভাবে Shutdown হয়ে নিরাপদ অবস্থায় থাকতে পারবে।
সার্বিক মনিটরিংয়ের জন্য Main Control Roomসহ একাধিক কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা প্ল্যান্টের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিয়মিতভাবে Safety Analysis Report হালনাগাদ করে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (BAERA)-এর অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হবে। পাশাপাশি IAEA-এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশন ভবিষ্যতেও নিয়মিত পরিচালিত হবে।
বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল?
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে নানা প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থায়ন। Rosatom-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণচুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা হয়েছে।
নির্মাণ পর্যায়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল Soil Stabilization। ভূমিকম্পসহ অন্যান্য নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে উন্নত প্রকৌশল কৌশলে মাটির ভেতরে সিমেন্ট ইনজেক্ট করে সেটিকে Semi-Rock অবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আর্থিক লেনদেন, যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও পরিবহনে জটিলতা তৈরি হলেও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা হয়েছে।
COVID-19 মহামারির সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত জনবল দিয়ে ধাপে ধাপে কাজ চালিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ কী?
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাই গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও লোড ব্যালান্স সঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ লক্ষ্যে Power Grid Company of Bangladesh (PGCB), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিশন লাইন, সাবস্টেশন উন্নয়ন এবং আধুনিক গ্রিড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী Safety Culture বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউনিট-১ পরিচালনায় কতজন জনবল প্রস্তুত?
তিনি জানান, ইউনিট-১ পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, যা রাশিয়ার উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং Novovoronezh Nuclear Power Plant-এ পরিচালিত হয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের রূপপুরে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও অন-সাইট ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ধাপ শেষে Knowledge Assessment পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের দেওয়া হয়েছে Independent Work Permit (IWP)।
এ পর্যন্ত NPCBL-এর ৫১ জন কর্মকর্তা BAERA-এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। এছাড়া ১ হাজার ৫০০-এর বেশি অপারেশনাল ও সহায়ক কর্মী বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন এবং ধাপে ধাপে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করছেন।
দেশীয় দক্ষ জনবল বাড়লে ব্যয় কমবে
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশীয় দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালন ব্যয় ধীরে ধীরে কমে আসে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় ব্যয়ও বেশি হয়। তবে দেশীয় জনবল পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করলে অপারেশনাল ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব।
পারমাণবিক জ্বালানির নিশ্চয়তায় কী পদক্ষেপ?
তিনি বলেন, রূপপুর প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান TVEL-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি Framework Agreement স্বাক্ষর করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী TVEL ধারাবাহিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করতে বাধ্য। ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা নেই।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে?
ড. জাহেদুল হাসান বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের প্রায় এক বছর পর ব্যবহৃত জ্বালানি (Spent Fuel) রিঅ্যাক্টর থেকে বের করা হবে।
এগুলো প্রথমে বিশেষভাবে ডিজাইন করা Spent Fuel Pool-এ সংরক্ষণ করা হবে, যেখানে পানি দ্বারা Cooling ও Radiation Shielding নিশ্চিত করা হবে।
এই পুলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া বর্জ্য ফেরত নিয়ে যাবে।
পূর্ণাঙ্গ পরিচালন সক্ষমতা অর্জনে কতদিন লাগবে?
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী একটি আধুনিক Generation III+ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ব অপারেশনাল সক্ষমতায় পৌঁছাতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে।
রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং BAERA-এর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হয়েছে।
তবে পূর্ণাঙ্গ স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য বাস্তব অপারেশনাল অভিজ্ঞতা, জটিল কারিগরি সমস্যা সমাধান, Predictive Maintenance এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয়গুলো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, Periodic Safety Review এবং Operational Feedback-এর মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই পরিচালন সক্ষমতা অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
