চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ১

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৭:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

  নোয়াখালী প্রতিনিধি

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার শরীফপুরে দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর ছেলে রাকিবকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ করেছে স্বজনরা। নিহতের স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় মামুন ও তার বাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

এদিকে রাকিব হত্যার বিচার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সোমবার সন্ধ্যায় এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল করে। সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

হত্যাকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ফাঁসি কার্যকর না হলে নোয়াখালীর সকল রেমিটেন্স শাটডাউন করার হুঁশিয়ারি দেন নিহতের স্বজনরা।

নিহত রাকিব শরীফপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খানপুর গ্রামের ভোলা হাজী বাড়ির সৌদি প্রবাসী মো. হানিফের ছেলে। ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের উপস্থিতিতে রাকিবের মরদেহ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার ৩ নম্বর আসামি সাইফুল ইসলামকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত সাইফুল একই গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রাকিবের চাচার বাড়িতে নির্মাণাধীন একটি পাকা ভবনের কাজ চলছিল। এ সময় আসামিরা ওই কাজে চাঁদা দাবি করে। বিষয়টি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাকিব ও তার ছোট ভাইয়ের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা রাকিবকে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এবং তার ছোট ভাইকে আহত করে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নিহতের স্বজনসহ সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ নিহতের লাশ দেখতে ও জানাজার নামাজে অংশগ্রহণের জন্য ভিড় জমায়। নিহতের বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় আকাশ যেন ভারী হয়ে ওঠে। জানাজার নামাজপূর্ব আলোচনায়ও স্বজনদের কান্নায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে আগত সাধারণ মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।

নিহতের বাবা প্রবাসী মো. হানিফ, চাচা প্রবাসী জসীম উদ্দীন ও স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের পাকমুন্সিরহাট বাজার এলাকায় তাদের একটি চারতলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ১০-১৫ দিন আগে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মামুন প্রকাশ বাঙারী মামুনের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে তার ভাতিজা রাকিবের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। রাকিব চাঁদা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

এ সময় তারা দাবিকৃত চাঁদা না দিলে ভবনের নির্মাণকাজ করতে দেবে না বলে হুমকি-ধমকি দেয়। ঘটনাটি রাকিব প্রবাসে অবস্থানরত চাচা জসীমকে ফোনে জানান। জসীম ভাতিজাকে বলেন, দেশে ফিরে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। ২৬ মে ২০২৬ জসীম প্রবাস থেকে দেশে আসেন। ৩০ মে শনিবার রাতে তারা রাকিবের কাছে ফের চাঁদা দাবি করে। রাকিব অপরাগতা প্রকাশ করলে চাঁদাবাজদের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়।

পরে রাকিব তার ছোট ভাই রিমনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তরা তাদের পথরোধ করে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা রাকিবকে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ সময় ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে ছোট ভাই রিমনকেও পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

জসীম উদ্দীন আরও অভিযোগ করেন, নির্মাণাধীন ভবন থেকে ৮-১০ লাখ টাকার রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায় চাঁদাবাজরা।

ঘটনার পরদিন রোববার সকাল ১১টার দিকে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে বসতঘর ও রান্নাঘরসহ আটটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত শরীফপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক মামুনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মো. ফারুক বলেন, মামুন শরীফপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক। বর্তমানেও প্রস্তাবিত কমিটিতে তাকে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়েছে। ফারুক দাবি করেন, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মামুন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সে কোনো অন্যায় বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা ও অসত্য।

এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ থানার কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সোমবার ১ জুন সকালে নিহতের মা যোবেদা খাতুন বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনকে এজাহারভুক্ত এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ওসি মো. শামসুজ্জামান আরও বলেন, মামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে আসামিকে নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং এলাকায় পুলিশ মোতায়েন আছে।