বাজারে আসছে হাঁড়িভাঙা আম, ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ২২:০১ | অনলাইন সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় রংপুরের সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আম। রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় এই আমের চাষ ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। হাঁড়িভাঙা আম বদলে দিয়েছে অনেক মানুষের ভাগ্য এবং এটি এখন রংপুরের একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এবার হাঁড়িভাঙা আমের ফলনও ভালো হয়েছে। মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি বিভাগ ১৫ জুন থেকে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম বাজারজাত করার জন্য আমবাগানের মালিক ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়েছে। আর এই আমকে কেন্দ্র করে চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ৩০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমচাষিরা ইতোমধ্যে গাছ থেকে আম সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি হাঁড়িভাঙা আমের বাগান। গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে আম। আম পরিপক্ব হওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের বেঁধে দেওয়া সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন অধিকাংশ চাষি। তবে কেউ কেউ আম পাড়া শুরু করেছেন। তাঁদের দাবি, অতিরিক্ত গরমের কারণে এ বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই আম পাকা শুরু হয়েছে।

কৃষি বিভাগ ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাঁড়িভাঙা আম জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পাওয়া যায়। পাকা আম থেকে মাঝারি মাত্রার সুগন্ধ ছড়ায়। বর্তমানে মিঠাপুকুর ছাড়াও রংপুরের বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, পীরগঞ্জ, পীরগাছাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হাঁড়িভাঙা আম চাষের বিস্তার ঘটছে।

তেকানী গ্রামের কৃষক সহিদার রহমান বলেন, আগে তিনি দুই একর জমিতে ধান ও আলুর চাষ করতেন। আট বছর আগে সেই জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান করেছেন। জমির ফসল বিক্রি করে আগে বছরে তাঁর লাভ হতো ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা। গত বছর তিনি বাগানের আম বিক্রি করে পেয়েছিলেন ৪ লাখ টাকা। এবার তিনি আরও বেশি লাভের আশা করছেন।

সাত একর জমিতে আমের বাগান করেছেন খোড়াগাছ গ্রামের সিরাজুল ইসলাম। গত তিন বছরে আম বিক্রি করে গড়ে তিনি ১৪ লাখ টাকা আয় করেছেন। তিনি বলেন, ধান চাষ আর আম চাষে লাভের পার্থক্য আকাশ-পাতাল।

তেকানী গ্রামে ঢুকতেই আসমা খাতুনের বাড়ি। তাঁর স্বামী এনামুল হক অসুস্থ। কাজ করতে পারেন না। আগে অন্যের বাড়িতে ও আমবাগানে কাজ করতেন আসমা। বাড়ির সামনে ১২ শতক জমি ও আঙিনায় হাঁড়িভাঙার বেশ কিছু চারা লাগিয়ে তিন বছরের মাথায় সংসারে সচ্ছলতা আনতে পেরেছেন। এখন আম বিক্রি ও গাভি পালনের আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৯ শতক জমিও কিনেছেন। তাঁর স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান। বাড়ির সামনে লাগানো আমগাছ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘বাহে, আম নোয়ায় এইগল্যা, যেন টাকার গাছ। একনা গাছোত পাতা যত, আম বেচাইলে টাকাও পামো তত। আমোত কোনো লস নাই, তেমন খরচও নাই। খালি ৫০০-৬০০ টাকার সার ও ওষুধ দিলে পাঁচ বছরের একটা গাছোত লাভ হইবে চার হাজার টাকা। এমতোন লাভ অন্য সষোত নাই।’

খোড়াগাছ ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় আমের বাজার পদাগঞ্জ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা আম কিনতে এই বাজারে আসেন। বাজারের আম ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান বলেন, দিন যত যাচ্ছে, বাজারে হাঁড়িভাঙা আমের চাহিদাও তত বাড়ছে। আমকে ঘিরে ছোট-বড় অনেক ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে হাজারো মানুষের।

মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, মিঠাপুকুরে প্রতিবছর হাঁড়িভাঙা আমের চাষ বাড়ছে। লাভ বেশি হওয়ায় অনেকে ধানি জমিতে আমের বাগান করছেন। বর্তমানে ১ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৭৫টি হাঁড়িভাঙা আমের বাগান রয়েছে। গত বছর ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়েছে। এ বছর ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার বেশি হাঁড়িভাঙা আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। সব ধরনের মাটিতে এ আমের চাষ করা গেলেও এঁটেল ও দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। এক একর জমি থেকে বছরে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। মাঝারি প্রতিটি গাছে সার ও কীটনাশক বাবদ বছরে খরচ হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। পাঁচ বছর বয়সী প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার হাজার টাকার আম বিক্রি করা যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, হাঁড়িভাঙা আম এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই আম রপ্তানি করা হচ্ছে। দেশের ভেতরে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার গত কয়েক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই আমের ব্র্যান্ড ভ্যালুও বেড়েছে, যা ভালো দাম নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে। এই আম ঘিরে বিশাল বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকলেও হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব নিয়ে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হাঁড়িভাঙা আম দ্রুত পচনশীল হওয়ায় পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন বা দ্রুতগতির যানবাহনের ব্যবস্থা করা উচিত।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।

তিনি বলেন, এবার আমের ‘অন ইয়ার’। প্রচুর আম ধরেছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে কিছু থিনিং হয়ে গেছে। এতে বাকি আমগুলোর আকার বড় হতে পারে। সঠিক পরিচর্যা করলে উৎপাদনে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া হাঁড়িভাঙা আম বাজারজাত করতে এবার যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হবে। বিশেষ করে পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।