মোবারকপুর রেলগেট যেন মৃত্যুফাঁদ, ঝুঁকিতে যানবাহন চলাচল

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ১৬:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  সিদ্দিক হোসেন, দিনাজপুর

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর মোবারকপুর রেলগেট যেন ধীরে ধীরে একটি ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। গেটম্যান নেই, নেই স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও শত শত যানবাহন জীবন হাতে নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছে।

ফুলবাড়ী পৌর শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত মোবারকপুর রেলগেট। পৌর এলাকার পাশাপাশি আশপাশের ৩৫ থেকে ৪০টি গ্রামের মানুষের শহরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ এটি। বিকল্প পথে যেতে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার ঘুরতে হয় বলে অধিকাংশ মানুষ এই রেলগেট ব্যবহার করেন। এরপরও রেলগেটের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেই।

প্রতিবছর এখানে অর্ধশতাধিক ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে এবং গড়ে ৬ থেকে ৭ জন প্রাণ হারান। তবুও নিরাপত্তা জোরদারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

স্থানীয় চা দোকানি হামিদুল হক বলেন, প্রতিদিন এ পথে ১২টি আপ ও ১২টি ডাউন যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। এর বাইরে রয়েছে মালবাহী ট্রেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে এ পথ ব্যবহার করেন। গেটম্যান না থাকায় ট্রেন আসার আগাম কোনো সতর্কতা পাওয়া যায় না। অনেক সময় মানুষ রেললাইনে উঠে ট্রেনের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন। তখন হঠাৎ ট্রেন চলে এলে ঘটে দুর্ঘটনা।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘গেটম্যান না থাকায় কখন ট্রেন আসে, তা বোঝা কঠিন। প্রতিদিন ভয় নিয়ে পার হতে হয়। চোখের সামনে একাধিক দুর্ঘটনা দেখেছি।’

মোবারকপুরের বাসিন্দা রশিদুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার দুই ব্যবসায়ী মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন। কয়েকদিন আগে একটি উন্নয়ন সংস্থার দুই কর্মীও একইভাবে প্রাণ হারান।

রিকশাভ্যান চালক আব্দুল হাই বলেন, ‘দুই মাস আগে এক ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি মোটরসাইকেলসহ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যান। তাঁর পরিচয়ও পরে জানা যায়।’

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্ঘটনার বড় কারণ হলো রেলগেটের দুই পাশে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া। রেললাইনের পাশে থাকা কয়েকটি ঘর, চায়ের দোকান ও বড় গাছের কারণে দূর থেকে ট্রেন দেখা যায় না। ফলে চালক ও পথচারীরা ঝুঁকিতে পড়েন।

মোবারকপুর এলাকার রেলপথ তদারকির দায়িত্বে থাকা কিম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী মাহাবুবুল আলমও স্বীকার করেন, গেটম্যান না থাকায় মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। তাঁর মতে, গেটম্যান থাকলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব।

ফুলবাড়ী রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. রেজাউল করিম বলেন, গেটম্যান নিয়োগের বিষয়টি রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে এখানে গেটম্যান থাকলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

পার্বতীপুরের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) শেখ আল আমিন জানান, মোবারকপুর একটি ‘বি-গ্রেড’ রেলগেট। এলাকাবাসী আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মোবারকপুর রেলগেটের বর্তমান অবস্থা ও অনুমোদন খতিয়ে দেখে গেটম্যান নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।’

স্থানীয় হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, প্রতিদিন এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন ব্যস্ততম রেলগেটটি পারাপার হয়। মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। জননিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে আসবে।

পার্বতীপুর জিআরপি রেলওয়ে পুলিশের ওসি মো. মাহমুদুন্নবী বলেন, চার দিন আগে থানায় যোগদান করেছি। মোবারকপুর রেলগেটের বিষয়টি শুনেছি। এটি খতিয়ে দেখা হবে।