পাবনা-ঢাকা ট্রেন চালুর আশায় ঈশ্বরদীর লাল কুলিরা

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১৬:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

সবার পরনে লুঙ্গি। গায়ে লাল রঙের হাফহাতা শার্ট। কাঁধে গামছা। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ভেতরে ও বাইরে চোখে পড়বে এমন দৃশ্য। কোথাও একা, আবার কোথাও কয়েকজন একত্রে বসে কিংবা খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তারা। উদ্দেশ্য, কোনো যাত্রীর ব্যাগ বা মালামাল ট্রেন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া কিংবা ট্রেন থেকে মালামাল স্টেশনের বাইরে এনে দেওয়া। বিনিময়ে পান ৪০ থেকে ৮০ টাকা মজুরি। সবাই তাদের ‘লাল কুলি’ বা ‘স্টেশন কুলি’ বলেই চেনেন।

উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত শতবর্ষী ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনের কুলিদের নিত্যদিনের দৃশ্য এটি। এখানে ২৪ ঘণ্টা পর দুপুর ২টায় শিফট বদল হয়। প্রতিটি শিফটে একজন সর্দার থাকেন। ২৪ ঘণ্টার শিফট শেষে মোট আয় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, যাকে তাদের ভাষায় বলা হয় ‘ভাগা’।

একসময়ের জমজমাট ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনের লাল কুলিদের আয় এখন তলানিতে ঠেকেছে। ফলে তারা চরম কষ্ট ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ট্রেন ও মালামাল পরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় স্টেশনে প্রায় ৮০-১০৫ জন লাল কুলির কাজ নেই বললেই চলে। কাজের অভাব ও বয়সের ভারে কুলিদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন দুই শিফটে দাঁড়িয়েছে ২৬-২৭ জনে। এরপরও যারা পেশাটি আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদের একজনের ২৪ ঘণ্টার এক শিফটে ভাগা হয় মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। ফলে পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

এমনই এক দুপুরে স্টেশনের পশ্চিম পাশে ওভারব্রিজের সিঁড়ির পাশে তিনজন সহকর্মীকে নিয়ে ট্রেন ও যাত্রীদের লাগেজের অপেক্ষায় ছিলেন চলতি শিফটের সর্দার চাঁদ আলী।

উপজেলার গোকুলনগর গ্রামের বাসিন্দা চাঁদ আলী বলেন, ২৪ ঘণ্টার শিফটে কাজ করে তিনি আজ পাবেন ৩০০ টাকা। একসময় এ স্টেশনে প্রায় ৩০০ কুলি কাজ করতেন।

পরে কথা হয় পরবর্তী শিফটের সর্দার সাজউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ৩৭ বছর ধরে এই জংশন স্টেশনে কুলির কাজ করছেন। এর মধ্যে ২৬ বছর কুলি সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, যখন কাজ শুরু করেন তখন ট্রেনের সংখ্যা বেশি ছিল। দুই শিফটে ১০৫ জন কুলি কাজ করতেন। ট্রেন কমার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে তাদের আয়। আয় কমতে থাকায় কমেছে কুলির সংখ্যাও। একসময় তা দাঁড়ায় ৬৫ জনে। পরে আয় আরও কমে যাওয়া, বয়সের ভার ও চিকিৎসার অভাবে এখন দুই শিফটে কুলির সংখ্যা নেমে এসেছে ২৬-২৭ জনে।

তিনি বলেন, আগে এক শিফটে একজন কুলি ৮০০, ৯০০, এমনকি ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাগা পেতেন। এখন ২৪ ঘণ্টার এক শিফটে ভাগা হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দুই ছেলে ও এক মেয়ের সংসার নিয়ে এই আয় দিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ জোগানো সম্ভব হচ্ছে না। বয়সের কারণে অন্য পেশাতেও যেতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়েই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এরপর কথা হয় ৪৪ বছর কুলির কাজ করে বর্তমানে অবসরে যাওয়া ফৈমুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ১০-১৫ বছর আগেও একজন কুলি এক শিফটে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। তখন প্রায় সব ধরনের পণ্যই ট্রেনে পরিবহন হতো। কাঁচামাল থেকে শুরু করে রড, সিমেন্ট, মুদি পণ্য, মাছসহ প্রায় সবকিছুই ট্রেনে আসত।

সরেজমিন অনুসন্ধানে কুলি, দোকানদার, স্থানীয় বাসিন্দা, রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী কাজী আশরাফ আলী এবং ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনের স্টেশন সুপারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় মালামাল পরিবহন ধীরে ধীরে ট্রেন থেকে সড়কপথে চলে যায়। ফলে কমতে থাকে কুলিদের আয়।

পরে ঈশ্বরদীর অদূরে বাইপাস স্টেশন চালু হলে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো মূল জংশন স্টেশন এড়িয়ে বাইপাস দিয়ে চলাচল শুরু করে। বন্ধ হয়ে যায় বেশ কয়েকটি লোকাল ট্রেনও। এতে লাল কুলিদের আয়ের অন্যতম উৎস বন্ধ হয়ে যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর আরও কিছু ট্রেন রুট পরিবর্তন করায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

কুলিরা বলেন, ‘ইনকাম কমে গেছে। লোকজন যা আসে, নিজেগো মালামাল নিজেরাই নিয়ে যায়। আমাগোরে টাকা দিতে চায় না। দিলেও ৪০-৫০ টাকা দিবার চায়। বৌ-পোলা-পান নিয়ে চলাই কষ্ট।’

তারা আরও বলেন, যেসব ট্রেন জংশন স্টেশন দিয়ে চলাচল করত, সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনা জরুরি। এতে লাল কুলি, হকার ও দোকানদারদের আয় বাড়বে।

স্টেশনের পুরোনো দোকানদার মো. জাকিরুল মাওলা বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে এই স্টেশন জমজমাট ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ব্যবসা ভালো ছিল। কিন্তু ট্রেনগুলো বাইপাসে চলে যাওয়ার পর যাত্রী কমে যায়, ফলে কুলি ও দোকানদারদের আয়ও কমে যায়।

স্থানীয়রা জানান, আগে যেখানে একজন কুলি দিনে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন, এখন তা নেমে এসেছে ২৫০-৩০০ টাকায়। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আয় না বাড়ায় তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের পোশাক ছিঁড়ে গেছে, পুষ্টিকর খাবার জোটে না, চিকিৎসাও করাতে পারেন না।

রোববার (২১ জুন) দুপুরে স্টেশন চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, কুলিরা প্রাইভেটকার বা সিএনজিতে আসা যাত্রীদের মালামাল বহনের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু কাজ খুব কম। তারা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রী বাড়লেও আগের মতো আয় বাড়েনি। অধিকাংশ যাত্রী নিজের মালামাল নিজেরাই বহন করেন।

দীর্ঘদিনের কুলি শ্রমিকরা বলেন, ‘অনেকটা বাধ্য হয়েই এ কাজ করি। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় থাকায় অন্য পেশায় যেতে পারি না। বয়সও বেশি হয়ে গেছে। সারাদিন কাজ করে যা আয় হয়, তাতে সংসার চালানোই কষ্টকর।’

একজন কুলি আক্ষেপ করে বলেন, ‘গরিব মানুষ আমরা। কিছু কইরা তো খাইতে হইবো। সারাদিন খাইটা চারশত থেকে পাঁচশ টাকা ইনকাম করি। কোনো দিন সেটাও হয় না। সংসার চালাইতেই জীবন যায়।’

ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঈশ্বরদী দিয়ে চলাচলকারী বেশ কিছু ট্রেনের রুট পরিবর্তনের কারণেই কুলিদের আয় কমেছে। সুন্দরবন, বেনাপোল, মৈত্রী, সিল্কসিটি ও পদ্মা এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন অন্য রুটে চলাচল করায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি পাবনা এক্সপ্রেসের মতো নতুন কোনো ট্রেন ঈশ্বরদী মূল জংশন স্টেশন হয়ে চলাচল করে, তাহলে কুলিদের আয় বাড়তে পারে।

এদিকে শনিবার (২০ জুন) সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী আগস্ট মাসেই ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এ রুটের জন্য লোকোমোটিভ প্রস্তুত রয়েছে। আগামী মাসে (জুলাই) নতুন কোচ আসবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগস্টেই পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এতে পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ার পাশাপাশি ঈশ্বরদী স্টেশনের লাল কুলিদের আয়ও কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।