ভাঙ্গুড়ায় অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১৬:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

  ভাঙ্গুড়া (পাবনা) প্রতিনিধি

দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান। তাঁর অবসর উপলক্ষে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়।

শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় সিক্ত এ আয়োজনের নানা মুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অতিথিদের চোখে অশ্রু ঝরতে দেখা যায়।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১০টায় দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। বহু বছর পর প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণায় মেতে ওঠেন তার অসংখ্য ছাত্র।

পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আব্দুল মতিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্রীড়া শিক্ষক শামসুজ্জামান বাবু।

স্বাগত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের সুপার আব্দুল জব্বার বলেন, ‘একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। মাওলানা মনিরুজ্জামান তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।’

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সহ-সুপার মাওলানা মেহেদী হাসান, ইংরেজি শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, কৃষি শিক্ষক হাফিজুর রহমান, গণিত শিক্ষক আক্কাস, আনিসুর রহমান, আরবি শিক্ষক আমেনা, খোদেজা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, তৌহিদুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল ইসলাম, প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান, বাইজিদ-সহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, মাওলানা মনিরুজ্জামানের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, শিক্ষক ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও তারা অবদান রাখছেন।

তারা আরও বলেন, বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। শিক্ষক হিসেবে তার অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে।

তারা আরও বলেন, ‘একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কর্ম, চরিত্র ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে মাওলানা মনিরুজ্জামান সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন। তার মতো শিক্ষকেরা জাতির নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।’

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।

ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার এ সম্মান গ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে মাওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি কোনোদিন ভাবিনি আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে এতটা ভালোবাসবে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তোমাদের ভালোবাসা ও দোয়া।’

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মরণ করেন তার কঠোর শাসনের কথা, আবার কেউ তুলে ধরেন পিতৃতুল্য স্নেহ ও মমতার স্মৃতি। সবার কণ্ঠে ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে মাওলানা মনিরুজ্জামান শুধু কুরআন, আরবি ও ফিকাহ শিক্ষা দেননি; গড়ে তুলেছেন অসংখ্য সৎ, আদর্শবান ও দ্বীনদার মানুষ।

তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে দুধবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তার শিক্ষা, আদর্শ ও অবদান শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।