প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই ঈশ্বরদী বিমানবন্দর

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১৭:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

  ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

ঈশ্বরদী বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেড, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডাল গবেষণা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসহ একাধিক বৃহৎ শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু এবং বিভিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থানের কারণে পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। তবে স্থানীয়দের এ দাবি বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট বক্তৃতায় পাবনা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল বলেন, ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এখন মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। সেখানে নিয়মিত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা যাতায়াত করছেন। এখানে একটি বিমানবন্দরও রয়েছে। অথচ বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। তিনি ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালুর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান।

বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সম্প্রতি বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে ৪৩৬ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৭০০ ফুট এবং প্রস্থ ৭৫ ফুট। দীর্ঘদিন সচল থাকার পর ১৯৯০ সালের ৫ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই পুনরায় বিমান চলাচল শুরু হলেও ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর আবারও তা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিমানবন্দরটি থেকে পুনরায় ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হয়। সে সময় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ প্রতি শনিবার ও সোমবার ঢাকা-ঈশ্বরদী-ঢাকা রুটে ৩৭ আসনের বিমান পরিচালনা করত। একমুখী ভাড়া ছিল ৪ হাজার টাকা এবং যাওয়া-আসার ভাড়া ছিল ৮ হাজার টাকা। কিন্তু যাত্রী সংকট ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে মাত্র ছয় মাস পর ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল আবারও ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বর্তমানে বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও বিমানবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সচল রয়েছে। এর যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেভিগেশন সরঞ্জাম ও অন্যান্য কারিগরি কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। বিমানবন্দরের রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন শাখায় বর্তমানে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। রানওয়ে, অ্যাপ্রন ও ট্যাক্সিওয়েও ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় রয়েছে।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, মোট ৪৩৬ দশমিক ৬৫ একর জমির মধ্যে ২৯০ দশমিক ৭৪ একর জমি সংলগ্ন মিলিটারি ফার্মের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১৪৫ দশমিক ৯১ একর জমি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরের এক কর্মচারী জানান, বাণিজ্যিক ফ্লাইট না থাকলেও বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের বহনকারী হেলিকপ্টার নিয়মিত এখানে ওঠানামা করে। তবে বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হলে বর্তমান রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে অন্তত ৬ হাজার ফুটে উন্নীত করা প্রয়োজন।

একসময় দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আকাশপথ যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। সংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও ঈশ্বরদী ইপিজেডকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হলে পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

বিমানবন্দর চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা নিশ্চিত না করা গেলে এ উদ্যোগের সাফল্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈশ্বরদীর খায়রুল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী শিল্পপতি আলহাজ খায়রুল ইসলাম বলেন, “ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ঈশ্বরদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ। এ গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই ১৯৬২ সালে বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। লোকসানের অজুহাতে এটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা দ্রুত বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর দাবি জানাই।”

ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আশিকুর রহমান নান্নু বলেন, “রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডের কারণে ঈশ্বরদীতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। তাদের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের স্বার্থে বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।”