আলমডাঙ্গায় ৪৫ লাখ টাকার এডিপি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ
শরীফ উদ্দীন, চুয়াডাঙ্গা

টেন্ডার আহ্বান ও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রচলিত নির্দেশনা উপেক্ষা করে আলমডাঙ্গা উপজেলা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ১৮টি প্রকল্প পছন্দের ব্যক্তিদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্প জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ১৮ নেতাকর্মী বা সমর্থকের নামে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি জানাজানি হলে সোমবার (২৯ জুন) উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আলমডাঙ্গা উপজেলা এডিপির অতিরিক্ত চতুর্থ কিস্তিতে ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি মূল্যের কারিগরি উন্নয়ন প্রকল্প স্থানীয় দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রকল্প প্রস্তাব গ্রহণেরও দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এসব নিয়ম অনুসরণ না করেই টেন্ডার ছাড়াই ১৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চুয়াডাঙ্গার অন্য তিন উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের বরাদ্দ টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আলমডাঙ্গায় তা করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১ জুন প্রকল্পগুলো প্রাথমিকভাবে বিভাজনের পর ১৪ জুন অনুষ্ঠিত সভায় ১৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে প্রকল্পগুলো অনুমোদিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলন প্রস্তুত করে আরএফকিউ (রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন) পদ্ধতিতে জুন মাসের মধ্যেই বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ ৭ জুন ও ১৪ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৃথক চিঠি দিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দের অর্থ টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু পরে ১৮টি প্রকল্প অনুমোদনের পর ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে রয়েছে কালিদাসপুরের মেসার্স নাসিমা এন্টারপ্রাইজ, হাউসপুরের শম্পা বিল্ডার্স, আলমডাঙ্গার মেসার্স সাত্তার এন্টারপ্রাইজের নামে দুটি এবং মো. হাফিজুর রহমান-এর নামে দুটি প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, হাফিজুর রহমান একজন হোটেল ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের দাবি, তিনি এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন।
অনুমোদিত ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১৪টি আরএফকিউ এবং চারটি প্রকল্প পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। আরএফকিউ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া সামগ্রী ও বাইসাইকেল বিতরণ, প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ার সরবরাহ, বিভিন্ন ইউনিয়নে সোলার লাইট স্থাপন এবং একাধিক রাস্তা উন্নয়ন ও সোলিংয়ের কাজ। অপরদিকে পিআইসি প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ, সোলার লাইট স্থাপন এবং ব্রিজ সংস্কার।
টেন্ডার ছাড়াই প্রকল্প বরাদ্দের খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার উপজেলা পরিষদ ও এলজিইডি কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ করেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সে সময় উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না। পরে নেতাকর্মীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ তুলে ধরেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে সব প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি কিংবা নিরপেক্ষ কোনো চেয়ারম্যান বা সদস্যকে একটি প্রকল্পও দেওয়া হয়নি। টেন্ডার ছাড়াই আইন লঙ্ঘন করে এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, এখনো কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি, অথচ জুন ক্লোজিং শেষ হয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কাজ সম্পন্ন না হলে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী তাওহীদ আহমেদ বলেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে এডিপির অতিরিক্ত চতুর্থ কিস্তির বরাদ্দের আওতায় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সময়ের স্বল্পতার কারণে কয়েকজন জামায়াত নেতা নির্দিষ্ট ঠিকাদার নির্বাচন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। উপজেলা মাসিক সমন্বয় কমিটির সভার রেজুলেশনের আলোকে কোটেশন আহ্বান করে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে কোটেশন কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী নিজস্ব সিদ্ধান্তে নয়, বরং উপজেলা মাসিক সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক কোটেশন পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এতে আমার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।
