আনারসের পর মধুপুরে সম্ভাবনার নতুন ফসল কাজুবাদাম
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

টাঙ্গাইলের আনারসের রাজধানী খ্যাত মধুপুর গড়ের পাহাড়ি লাল মাটিতে কাজুবাদাম চাষের নতুন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। পাহাড়ি উঁচু জমি, অনুকূল জলবায়ু ও লাল মাটির কারণে ভালো ফলন পাচ্ছেন তারা। তাই এ অর্থকরী ফসল ঘিরে মধুপুরে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
একই সঙ্গে কৃষি বিভাগ তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ ফসলের চারা রোপণের প্রায় দুই বছর পর থেকেই গাছে ফল আসা শুরু করে। রোপণের সময় গর্তে গোবরসহ প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হয়।
ফল ধরার সময় সঠিক পরিচর্যা ও পরিমিত সারের ব্যবহার ভালো ফলনের সম্ভাবনা বাড়ায়। প্রতিটি চারা ৭ থেকে ৮ মিটার দূরত্বে রোপণের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ফুল ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কাজুবাদামে। দৃষ্টিনন্দন এ দৃশ্য স্থানীয়দের পাশাপাশি আকর্ষণ করছে দর্শনার্থীদেরও। ফলে কৃষকদের পাশাপাশি কাজুবাদামের বাগানে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও বেড়েছে।
কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, মধুপুর গড়াঞ্চলের লাল ও অম্লীয় মাটি, উঁচু পাহাড়ি জমি এবং অনুকূল আবহাওয়া কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ মাটিতে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতি গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। আবার পাহাড়ি উঁচু জমিতে পানি জমে না থাকা কাজুবাদাম চাষের উপযোগিতার অন্যতম প্রধান কারণ।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরের কাজুবাদাম স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে এ অঞ্চলে আনারস, কলা, পেঁপে, আদাসহ বিভিন্ন মিশ্র ফসলের চাষ হচ্ছে। একইভাবে কাজুবাদামও অন্য ফসলের সঙ্গে একই জমিতে চাষ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক হানিফ মিয়া জানান, কৃষি বিভাগের সহায়তায় চারা সংগ্রহ করে তিনি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে গাছে আশানুরূপ ফল এসেছে। তার প্রত্যাশা, এটি এ অঞ্চলের লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হবে। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক কাজুবাদাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, এ অঞ্চলের অন্য ফসলের তুলনায় কাজুবাদাম বেশি লাভজনক হওয়ায় ভবিষ্যতে আনারসের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে এটি স্থান করে নিতে পারে।
অপর কৃষক লিটন মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মধুপুরের লাল মাটিতে আনারস চাষ করছেন। এখন কাজুবাদাম চাষের মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন দেখছেন।
তিনি জানান, ‘লাল মাটির খনিজ উপাদান, উঁচু জমির ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অনুকূল জলবায়ু কাজুবাদাম চাষের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, কাজুবাদাম একটি উচ্চমূল্যের ফসল, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মধুপুরের লাল মাটি এ ফসল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। একবার চারা রোপণ করলে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। মধুপুরসহ দেশের পাহাড়ি এলাকায় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কৃষি গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, টাঙ্গাইলের পাহাড়ি অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষের আওতায় আনতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মধুপুরের কৃষকদের নিয়মিত তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, পাহাড়ি লাল মাটিতে পানি জমে না বলে এ অঞ্চল কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পাশাপাশি এ অঞ্চলে প্রচলিত মিশ্র চাষ পদ্ধতির সঙ্গে কাজুবাদাম যুক্ত করে কৃষকরা একই জমিতে একাধিক লাভজনক ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।
