উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ ভূমিধসের শঙ্কা, তিন দিনে নিহত ১৬

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪২ | অনলাইন সংস্করণ

  কক্সবাজার অফিস

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভয়াবহ ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পের ১৯৩টি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজারো বসতি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ৪৮৯টি রোহিঙ্গা পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সতর্কতা সত্ত্বেও অনেকেই পাহাড়ি এলাকা ছাড়তে অনীহা দেখাচ্ছেন।

বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে উখিয়ার ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসার চার শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও সাতজন। নিহতরা সবাই কিশোরী শিক্ষার্থী। ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় পাঠদান চলাকালে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে। এতে বহু শিক্ষার্থী মাটিচাপা পড়ে। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।

উখিয়ায় দায়িত্বরত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, ঘটনাস্থল থেকে চার শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR জানিয়েছে, পাহাড়ধসে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হয়।

এ ঘটনায় গত তিন দিনে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১২ জন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। এর আগে উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প ও কক্সবাজার শহরের কয়েকটি এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ে ফাটল ও মাটিধসের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে ক্যাম্প-৯ থেকে ১৫ পর্যন্ত এলাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, অর্থসংকটের কারণে অনেক লার্নিং সেন্টার এখন আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার উপযোগী নয়। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ও বিভিন্ন কমিউনিটি স্পেসে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে পাহাড়ি ঢলের পানিতে উখিয়ার মধুরছড়া, বালুখালী ও লম্বাশিয়াসহ বিভিন্ন খাল উপচে কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ক্যাম্প-১০ এর বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়। একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ক্যাম্প-৪ এর বাসিন্দা মো. রফিক ও সলিম উল্লাহ।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, মাঝি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন।

অন্যদিকে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ফসলি জমি, সবজিক্ষেত, চিংড়িঘের ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধস মোকাবিলায় জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় দখল, বন উজাড় ও অনিয়ন্ত্রিত বসতির কারণে কক্সবাজারে ভূমিধসের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পুনর্বাসন ছাড়া এই সংকট থেকে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।