সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে উধাও লেটার রাইটার, রাজবাড়ী ডাকঘরে তোলপাড়

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৮:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  কামাল হোসেন, রাজবাড়ী

রাজবাড়ী শহরের রেলগেট এলাকার চা দোকানি প্রণব সাহা। ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত এক লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। গত ৬ মে সেই টাকা রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য জমা দিতে যান। ডাকঘর থেকে তাকে জানানো হয়, সার্ভারে সমস্যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে এসএমএস যাবে না। পরে দেওয়া হবে বলে একটি জমা রসিদ ধরিয়ে দেন লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। সেই বিশ্বাসে বাড়ি ফিরে যান প্রণব সাহা।

এরপর দুই-এক দিন পরপর তিনি ডাকঘরে গিয়ে খোঁজ নেন। প্রতিবারই তাকে বলা হয়, ‘সার্ভারের সমস্যার কারণে অনলাইনে টাকা জমার মেসেজ যাচ্ছে না, কিছুদিন পরে আসেন।’ এভাবে আড়াই মাস পার হওয়ার পর গত সপ্তাহে তিনি জানতে পারেন, যার হাতে তিনি টাকা দিয়েছিলেন সেই লেটার রাইটার শিহাব মৃধা তার মতো আরও অনেক গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। আর তার এক লাখ টাকাও কখনো ডাকঘরের হিসাবে জমা পড়েনি। ঘটনার পর থেকে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে প্রণব সাহার। রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে তার।

প্রণব সাহা বলেন, “আমার অনেক কষ্টের জমানো টাকা। এক লাখ টাকা ফেরত পাব কি না জানি না। প্রতিদিনই ডাকঘরে যাই। তারা বলে তদন্ত চলছে। বসে থেকে আবার ফিরে আসি। টাকা না পেলে আমি একেবারে পথে বসে যাব।”

প্রণব সাহার মতো অন্তত ৬০ জন গ্রাহক রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে টাকা জমা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কেউ এক লাখ, কেউ দুই লাখ, আবার কেউ তিন লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন। সবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছিলেন ডাকঘরের লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করে তিনি বর্তমানে পলাতক। শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।

ডাকঘর সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বদলি হওয়ার পর গত ৬ জুলাই নতুন পোস্টমাস্টার হিসেবে যোগ দেন শামীম আহমেদ। যোগদানের প্রথম দিনই এক গ্রাহক জমার একটি স্লিপ নিয়ে তার কাছে আসেন। স্লিপ দেখে সন্দেহ হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু হয়। পরে একের পর এক গ্রাহক একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আসতে থাকেন। এরই মধ্যে গত ১৩ জুলাই থেকে শিহাব মৃধা নিখোঁজ রয়েছেন।

সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতারণার শিকার অসংখ্য গ্রাহক সেখানে ভিড় করেছেন। কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ হতাশ, আবার কেউ কান্না চেপে বসে আছেন। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—“আমাদের টাকা কি ফেরত পাব?”

ভুক্তভোগীরা জানান, কাউন্টারে গেলে তাদের লেটার রাইটার শিহাবের কাছে পাঠানো হতো। শিহাব টাকা গ্রহণ করে একটি রসিদ দিতেন এবং পরে জমা বই নিয়ে যেতে বলতেন। কিন্তু পরে গেলেই নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হতো। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, তাদের নামে কোনো হিসাবই খোলা হয়নি।

ডাকঘরের বারান্দায় স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা খোকন শেখ। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন কষ্ট করে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। সেই টাকা স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র করার জন্য জমা দিই। কাউন্টারে গেলে তারা শিহাবের কাছে পাঠায়। আমরা তার কাছেই টাকা জমা দিই। এরপর কয়েকবার জমা বই নিতে এসেছি। প্রতিবারই বলা হয়েছে পরে আসেন। এখন শুনছি টাকা জমাই হয়নি। আমরা এখন কী করব?”

সদর উপজেলার লক্ষণদিয়া গ্রামের বৃদ্ধ সনৎ বিশ্বাস বলেন, “গায়ের রক্ত জল করে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। সেই টাকা এখন নেই। টাকার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। চোখে শুধু অন্ধকার দেখি। আমি শুধু আমার টাকাটা ফেরত চাই।”

নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, “আমি দুই লাখ টাকা জমা দিয়েছিলাম। এখন শুনছি জমাই হয়নি। শুধু একজন লেটার রাইটার এত বড় ঘটনা ঘটাতে পারে না। অফিসের ভেতরের কেউ না কেউ অবশ্যই জড়িত। আমি আমার টাকা ফেরত চাই, পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও চাই।”

এদিকে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট (তদন্ত)কে সদস্য সচিব এবং ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত) খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “যারা লিখতে-পড়তে পারেন না, তারা অনেক সময় লেটার রাইটারের সহযোগিতা নেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করার এখতিয়ার লেটার রাইটারের নেই। ঘটনাটি যখন ঘটেছে, তখন দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৬০ জন গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। টাকার পরিমাণ কোটি টাকার মতো হতে পারে। আমরা তদন্ত করছি। পাশাপাশি কীভাবে পুরো টাকা উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টাও করছি।”

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, “আমি ৬ জুলাই এখানে যোগ দিই। যোগ দেওয়ার প্রথম দিনই একজন গ্রাহক একটি জমা স্লিপ নিয়ে আসেন। স্লিপ দেখে বুঝতে পারি এটি শিহাবের হাতে লেখা। তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, মোবাইল ফোন ও এনআইডি-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে টাকা জমা হয়নি। অনেক সময় এমন হয় বলে সে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। পরে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করে। ১৩ জুলাই থেকে শিহাব অফিসে আসছে না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে সেখান থেকে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পোস্ট অফিস মানুষের আস্থার জায়গা। এখানে মানুষ চোখ বন্ধ করে টাকা জমা রাখে। এমন ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। কোনো অবস্থাতেই লেটার রাইটারের টাকা গ্রহণ করার ক্ষমতা নেই। আমরা শিহাবের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।”

এ বিষয়ে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের সাবেক পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র মুঠোফোনে বলেন, “গ্রাহক কীভাবে টাকা জমা দিয়েছেন বা কীভাবে আত্মসাৎ হয়েছে, তা আমি জানি না। কেউ আমার কাছে টাকা জমা দেয়নি। আমরা সব সময় গ্রাহকদের কাউন্টারে অথবা ট্রেজারারের কাছে টাকা জমা দিতে বলি। আমার কোনো গাফিলতি নেই। আমার অজান্তেই ঘটনা ঘটেছে।”

অভিযুক্ত শিহাব মৃধার বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার (২২ জুলাই) দুপুরে এই প্রতিবেদক তার গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একতলা পাকা বাড়িতে তার স্ত্রী ও ছোট ভাই অবস্থান করছেন। তবে স্ত্রী কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

শিহাবের ছোট ভাই মাহবুব মৃধা বলেন, “আমার ভাই প্রায় এক সপ্তাহ আগে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। তারপর আর বাড়িতে ফেরেনি। অফিসে কী হয়েছে বা টাকা-পয়সার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। আমাদের সঙ্গেও তার কোনো যোগাযোগ নেই। অফিস থেকে আমাদের ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়েছে।”

এদিকে অভিযুক্ত শিহাব মৃধার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঘটনার পর প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা দ্রুত টাকা উদ্ধার করে ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।