জরুরি সংস্কারে বদলাচ্ছে খুলনা নগরী, কমছে জলাবদ্ধতা
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ
খুলনা ব্যুরো

দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে দুর্ভোগ ছিল খুলনা নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। বর্ষা এলেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যেত, ব্যাহত হতো যান ও পথচারীদের চলাচল। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের ভোগান্তি যেন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক হিসেবে নজরুল ইসলাম মঞ্জু দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে বলে দাবি করছেন কেসিসির কর্মকর্তারা। জরুরি ভিত্তিতে ড্রেন ও সড়ক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেছে এবং নাগরিক ভোগান্তিও কিছুটা লাঘব হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চার মাসে ৪০টি প্যাকেজের কাজ
কেসিসি সূত্রে জানা যায়, গত এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন শুরু হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি প্যাকেজের সংস্কারকাজ সম্পন্ন বা চলমান রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার থোক বরাদ্দ থেকেই এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানো এবং জরাজীর্ণ সড়ক দ্রুত চলাচলের উপযোগী করাই ছিল এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
কেন এবার দ্রুত বাস্তবায়ন?
কেসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, অতীতে অধিকাংশ উন্নয়নকাজ নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় একটি ছোট সংস্কারকাজও শুরু হতে দেড় থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত। ফলে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক সড়ক ও ড্রেন বছরের পর বছর অবহেলিত থাকত।
বর্তমানে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী জরুরি ও সীমিত ব্যয়ের কাজ সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করায় দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে বলে তারা জানান।
‘আগে সিন্ডিকেটের দখলে থাকত কাজ’—অভিযোগ প্রকৌশলীর
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেসিসির একজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, অতীতে এডিপির থোক বরাদ্দের অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে ভাগ করে দীর্ঘমেয়াদি দরপত্র আহ্বান করা হতো। এতে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারচক্র অধিকাংশ কাজ পেয়ে যেত এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতো।
তার দাবি, বর্তমানে ছোট ছোট জরুরি প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সেই সুযোগ অনেকটাই কমে এসেছে। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দ দেখিয়ে কম কাজ করার প্রবণতাও কমেছে।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাবেক জনপ্রতিনিধি বা অভিযুক্ত ঠিকাদারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে দেখা গেল
নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, একাধিক সড়কে নতুন করে কংক্রিট ঢালাই করা হয়েছে। অনেক পুরোনো ড্রেন পরিষ্কার ও সংস্কার করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে। আগে যেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমত, সেখানে এখন তুলনামূলক কম পানি জমছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রয়েল মোড় এলাকায় ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষায় দীর্ঘক্ষণ পানি জমে থাকায় দোকান পরিচালনায় সমস্যা হতো। সম্প্রতি ড্রেন সংস্কারের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
নাগরিকদের অভিজ্ঞতা
টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা জোবায়ের হোসেন বলেন, ‘আগে অলিগলিতে হাঁটাই কঠিন ছিল। বৃষ্টি হলেই পানি উঠে যেত। এখন অনেক রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, ড্রেন সংস্কার হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা কমছে এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের চলাচলও সহজ হয়েছে।’
একই এলাকার বাসিন্দা জোসনা বেগম বলেন, ‘আগে রিকশা ঢুকতেই পারত না। এখন রাস্তা ভালো হওয়ায় শর্টকাট পথে সহজে চলাচল করা যাচ্ছে। তবে শুধু কয়েকটি এলাকায় নয়, পুরো নগরীতেই এ ধরনের দ্রুত সংস্কারকাজ হওয়া দরকার।’
কেসিসির ব্যাখ্যা
কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ করিম বলেন, ‘জরুরি কাজ দরপত্র বা কোটেশনের মাধ্যমে করতে গেলে অনেক সময় লাগে। তাই জনদুর্ভোগ কমাতে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) ২০২৫-এর ৯৯(১)(ডি) ধারার বিধান অনুযায়ী দ্রুত কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
তিনি দাবি করেন, ‘সব কাজই শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
উল্লেখ, খুলনা নগরীতে দ্রুত বাস্তবায়িত জরুরি সংস্কারকাজ নাগরিকদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু খণ্ড খণ্ড সংস্কার যথেষ্ট নয়। আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখলমুক্ত জলপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না।
পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের আমলে উন্নয়নকাজের নামে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
