পরিচর্যার অভাবে বিলাতি গাব গাছ এখন বিলুপ্তির পথে
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৫ | অনলাইন সংস্করণ
সনৎ চক্রবর্ত্তী, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)

একসময় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বিলাতি গাবের গাছ ছিল বেশ পরিচিত। তবে অপরিকল্পিতভাবে গাছ কেটে ফেলা, নতুন গাছ রোপণে অনাগ্রহ এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ পরিবেশ বদলে যাওয়ায় বর্তমানে এ ফলটি আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না।
বিলাতি গাব দেখতে অনেকটা আপেলের মতো। এর ত্বক হালকা বাদামি ও লোমশ এবং ভেতরের মাংসল অংশ হালকা ক্রিম রঙের। স্বাদে এটি বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে এ ফল পাকে এবং গ্রামাঞ্চলের বনবাদাড় বা বাড়ির আশপাশে অযত্নেই বেড়ে ওঠে। বাদুড় ফল খাওয়ার পর বীজ ছড়িয়ে দেওয়ায় সহজেই নতুন চারা জন্মায়। প্রতিকূল পরিবেশেও গাছটি টিকে থাকতে সক্ষম।
গ্রামাঞ্চলে বিলাতি গাবের রয়েছে নানামুখী ব্যবহার। কাঁচা অবস্থায় অনেকে এটি সবজি হিসেবে রান্না করে খান। আবার কেউ নুন-মরিচ দিয়ে মেখেও খেতে পছন্দ করেন। অপরিপক্ব অবস্থায় শিশুরা ভেতরের কোমল আঁটি খেয়ে থাকে। পাকা ফলের রং, স্বাদ ও সুগন্ধ একে অন্য ফল থেকে আলাদা করেছে।
দেশি গাব ও বিলাতি গাবের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। বিলাতি গাবের ইংরেজি নাম Mabolo। একে Korean mango বা Velvet apple নামেও ডাকা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Diospyros blancoi। এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি চিরসবুজ বৃক্ষ।
বিলাতি গাব গাছ মাঝারি আকারের এবং উচ্চতায় ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে গাছে ফুল ফোটে এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। কাঁচা ফল হালকা সবুজ বা বাদামি রঙের হলেও পাকলে উজ্জ্বল বাদামি কিংবা গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে। পাকা ফলের ভেতরের অংশ সাদা, মাখনের মতো নরম এবং সুগন্ধযুক্ত। ফল হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি এটি দিয়ে জুস, ডেজার্ট, ফ্রুটকেক ও ক্রিমও তৈরি করা হয়।
পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ বিলাতি গাব। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য অংশে রয়েছে প্রায় ৫০৪ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৮৩–৮৪.৩ গ্রাম জলীয় অংশ, ২.৮ গ্রাম আমিষ, ০.২ গ্রাম চর্বি, ১১.৮ গ্রাম শর্করা, ১.৮ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ১১.৪৭ গ্রাম চিনি, ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৫ আইইউ ভিটামিন-এ, ১৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৬ মিলিগ্রাম আয়রন, ০.০২ মিলিগ্রাম থায়ামিন, ১৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি, ১১০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম এবং ৩০৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম।
সম্প্রতি বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি গাছে গোলাপি রঙের বিলাতি গাব শোভা পাচ্ছে। এর অপরূপ সৌন্দর্য পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
বোয়ালমারী চৌরাস্তার ফলপট্টিতে কথা হয় গাব বিক্রেতা আবদুল মান্নান মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, “এক সময় ফরিদপুর অঞ্চলে বিলাতি গাব প্রচুর পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। যা দু-একটি পাওয়া যায়, তার দামও অনেক। নতুন প্রজন্মও এ ফলের সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। আমাদের বাড়ির একটি গাছে ফল ধরেছে। সেগুলোই বিক্রির জন্য এনেছি। প্রতিটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”
বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, “বিলাতি গাব অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। একসময় ফরিদপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কমবেশি গাব গাছ ছিল। এ গাছে বিশেষ সার বা ওষুধের প্রয়োজন না হলেও নিয়মিত পরিচর্যা দরকার। পরিচর্যার অভাবেই গাব গাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গাব মূলত দুই ধরনের—দেশি গাব ও বিলাতি গাব। বিলাতি গাব মিষ্টি ও সুস্বাদু, আর দেশি গাব তুলনামূলক কম মিষ্টি এবং কিছুটা কষযুক্ত। দেশি গাবের কাঁচা ফল সবুজ এবং পাকলে হলুদ রঙ ধারণ করে।”
