এলএসডির থাবায় ঈশ্বরদী, বেসরকারি হিসাবে শতাধিক গরুর মৃত্যু
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি

হেনা খাতুন। স্বামী আসলাম প্রামাণিককে সঙ্গে নিয়ে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা থেকে গায়ে (শরীরে) চাকা চাকা দাগ ও পা ফুলে যাওয়া ৫ মাস ৩ দিন বয়সী বাছুরকে চিকিৎসার জন্য ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে আসেন ঈশ্বরদী প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে। হঠাৎ দেখেন, বাছুরটির অত্যধিক জ্বর, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ এবং গায়ে চাকা চাকা দাগ ও পায়ের গিরা ফুলে গেছে। তাই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
তার বাড়িতে পারিবারিকভাবে পালন করতেন ৩টি গরু। এর মধ্যে ১টি গরু বিক্রি করেন। এখন রয়েছে ১টি গাভী ও ১টি বাছুর।
এটি শুধু হেনা খাতুনের গরুর চিত্র নয়। পুরো ঈশ্বরদী উপজেলায় এখন খামারিদের কাছে আতঙ্কের এক নাম এলএসডি। এ রোগের ভ্যাকসিন-স্বল্পতা এবং সময়মতো চিকিৎসা না হওয়ায় মারাও যাচ্ছে বাছুর। এতে লোকসানের মুখে পড়ছেন গরু পালনকারী ও খামারিরা।
অরণকোলা পশুর হাটের পাশে রাকিব ডেইরি ফার্ম চাচা-ভাতিজা মিলে পরিচালনা করেন। এই খামার প্রাঙ্গণে গতকাল সোমবার খামার মালিক মারুফ হাসান বলেন, গত ৪-৫ বছর ধরে আমাদের এখানে গরুর স্কিন ডিজিজ রোগ আসে। এই রোগটি এখন চলমান। অরণকোলা এলাকায় ২০-২৫টি খামার আছে। প্রতিটি খামারেই ল্যাম্পি স্কিন রোগে গরু মারা যায়। এসব গরুর চামড়াও বিক্রি হয় না। এই রোগের কারণে প্রায় প্রতিটি খামারিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এখানেই কথা হয় প্রাক্তন খামারি সোলেমান আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার বাড়ি হাটের পাশে। ল্যাম্পি স্কিন হলে গরু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খামারিরা।
খামারিরা জানান, রোগের কারণে গাভী গরুর দুধ উৎপাদন কমে গেছে এবং চিকিৎসার খরচও বেড়েছে। এতে খামার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকেই আতঙ্কে আছেন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরো বেশি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
খামারি ও স্থানীয় চিকিৎসকরা বলেন, ‘৫-৬ মাস বয়সী বাছুর এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ সময় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেওয়ায় দুর্বল হয়ে অনেক বাছুর মারা যাচ্ছে। এ রোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে। গরুর মালিকদের সচেতনতার অভাব ও ভ্যাকসিন সংকটে গরুর মৃত্যুরোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। একটা বাছুর একটু বড় হলে ২৫-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। মারা গেলে আমাদের পুরোটাই ক্ষতি।’
খামারি ও বাড়িতে পালনকারী গরুর মালিকরা এবং স্থানীয় চিকিৎসক জানান, ঈশ্বরদীতে ল্যাম্পিং ডিজিজ রোগে আক্রান্ত গরুর মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। ঈশ্বরদীর বিভিন্ন গ্রাম ও খামারে পালনকারী গরুর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে বাছুর। বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে এই উপজেলায় মারা গেছে প্রায় ২৫০ গরু। পর্যাপ্ত পরিমাণে এ রোগের ভ্যাকসিন না থাকায় আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, উপজেলায় খামারি ও বাসাবাড়িতে পালন করা গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার। এর মধ্যে এ বছর ল্যাম্পিং ডিজিজ রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি। ল্যাম্পিং ডিজিজ রোগে আক্রান্ত গরুর মধ্যে মারা যাচ্ছে বেশির ভাগই বাছুর গরু।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্জন ডা. ফারুক হোসেন জানান, গত জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে আসা আক্রান্ত ২৫টি গরুর মধ্যে ১০টি বাছুর গরু মারা গেছে। তিনি জানান, উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম গরুর হাট অরণকোলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রায় ৩০টি খামারসহ উপজেলার বিভিন্ন বাড়িতে পারিবারিকভাবে পালন করা গরুর মধ্যে অনেক গরু ল্যাম্পিং স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত বড় গরুগুলো বাঁচানো গেলেও বেশিরভাগ বাছুর গরুকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
ভুক্তভোগী গরুর মালিকরা বলছেন, এই মৃত্যুর হার রীতিমতো উদ্বেগজনক। উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের মানিকনগর গ্রামের আজাহার মোল্লার ১টি, একই গ্রামের আনিসুর রহমানের ১টি, বক্তারপুর গ্রামের ওয়াসিমের ১টি, পৌরসভার রেজাননগর এলাকার তুহিনের ১টি, পাকশী ইউনিয়নের মেরিনপাড়া এলাকার দীপা খাতুনের ১টি, সলিমপুর ইউনিয়নের সেখেরদারি গ্রামের পাপ্পুর ১টি, মুলাডুলি ইউনিয়নের আরকান্দি গ্রামের আব্দুর রশিদের ১টি, পাকশী ইউনিয়নের চররূপপুর গ্রামের মিঠুনের ১টি এবং সাহাপুর ইউনিয়নের তিলকপুর গ্রামের ইমারুল সরদারের ১টি গরু স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
এটি সরকারি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য। কিন্তু স্থানীয় খামারি, বাড়িতে গরু পালনকারী ও স্থানীয় চিকিৎসকরা জানান, এই তথ্যের কয়েকগুণ বেশি গরু মারা গেছে।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদীতে গবাদিপশুর ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ (Lumpy Skin Disease) বা এলএসডির (LSD) প্রাদুর্ভাব নিয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. ফারুক হোসেন বলেন, বর্তমানে গবাদিপশুর মধ্যে ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী, গত এক মাসে (জুলাই) ৩০টিরও বেশি আক্রান্ত কেস নথিবদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে ১ থেকে ২০ তারিখের মধ্যেই ২৫টি কেস শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষ চিকিৎসা নেই। প্রতিকারে একমাত্র কার্যকর উপায় হলো ভ্যাকসিনেশন বা টিকাদান। সরকারিভাবে যে পরিমাণ ভ্যাকসিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল, তা পাওয়া গেলেও চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল।
প্রাপ্তবয়স্ক গরুর তুলনায় ছোট বাছুরগুলো এই রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। জুলাই মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০টি বাছুর মারা গেছে। তিনি বলেন, গরুগুলো মারা যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করা গেছে— সঠিক সময়ে টিকাদান না করা এবং মালিকদের অসচেতনতা ও অপচিকিৎসা। এর ফলে সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হচ্ছে এবং বাছুরের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
ঈশ্বরদীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাহাপুর ইউনিয়ন (সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকা), দাশুড়িয়া ইউনিয়ন, সলিমপুর ইউনিয়ন ও সাঁড়া ইউনিয়ন। পাকশী ইউনিয়ন এবং পৌরসভা এলাকার ভেতরে আক্রান্তের হার তুলনামূলক কম।
তিনি আরো বলেন, গবাদিপশুকে এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচাতে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং হাতুড়ে চিকিৎসা পরিহার করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তিনি জানান, ল্যাম্পি স্কিন রোগটি বাংলাদেশে খুব বেশিদিন আগে আসেনি। এটি ২০২১-২২ সালের দিকে প্রথম দেখা দেয়। শুরুতে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের দিকে বেশি থাকলেও পরে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঈশ্বরদী অঞ্চলেও এটি খুব দ্রুত ছড়িয়েছে।
ঈশ্বরদীতে শুরুতে এই রোগে বড় বড় ষাঁড় গরু বেশি আক্রান্ত হতো এবং মারা যেত। কিন্তু বর্তমানে বড় গরুগুলোর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় এখন ৩-৪ মাসের ছোট বাছুররা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বাছুরদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা খুব দ্রুত মারা যাচ্ছে।
এই রোগের একমাত্র সমাধান হলো ভ্যাকসিনেশন। শীতের শেষে এবং গরমের শুরুতে ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি। যেহেতু এটি মশা-মাছির কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় এবং গরমের শুরুতে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়ে যায়, তাই এই সময়েই ভ্যাকসিন দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
ল্যাম্পি স্কিন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর সরাসরি কোনো চিকিৎসা নেই। তবে সাপোর্টিভ চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেন কেউ হাতুড়ে বা পল্লী চিকিৎসকের কাছে না যায়, কারণ তারা প্রায়ই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে, যা এই রোগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আক্রান্ত গরুকে জ্বরের বা ব্যথার ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। ঘরোয়াভাবে নিম পাতা, লেবুর রস, খাবার সোডা, গুড় এবং স্যালাইন মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। ছোট বাছুরকে সব সময় ঠান্ডা ও বাতাসযুক্ত পরিবেশে রাখতে হবে। দিনে দুইবার মাথায় পানি দেওয়া এবং গা মুছে দেওয়া প্রয়োজন। দ্রুত সুস্থতার জন্য ভিটামিন পাউডার গুলিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
এদিকে জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য ও শহরের রেলগেট এলাকার ৩০ বছরের চামড়া ব্যবসায়ী মো. কামাল হোসেন জানান, ল্যাম্পিং স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত চামড়ার কোনো দাম নেই। এ জন্য গরুর খামারিরা আক্রান্ত গরুর চামড়া আনলে কোনো দাম পান না। ভালো গরুর চামড়া প্রতিটি ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে কিনলেও আক্রান্ত গরুর চামড়ার কোনো দাম নেই। এতে খামারিদের পাশাপাশি আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
গত কোরবানির ঈদে একই অবস্থা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ভালো চামড়া ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত প্রতিপিস বিক্রি হলেও আক্রান্ত গরুর চামড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। এই চামড়ায় লবণ দিলে লবণের দামও উঠে না।
