ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে মৃত্যু: তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

  ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযানে অংশ নেওয়া তৎকালীন ডিবির ওসিসহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে জেলা পুলিশের গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি।

তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও গুরুতর দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

জেলা পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সদস্যের ভূমিকা পর্যালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পুলিশ সদর দপ্তর।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, “তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”

গত ২০ জুন বিকেলে মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ২১ জুন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ইশতিয়াক মধুখালীর পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী এবং ফরিদপুর চিনিকলের মৌসুমি শ্রমিক ছিলেন।

মৃত্যুর পরদিন ডিবির এসআই আহাদুজ্জামান বাদী হয়ে নিহত ইশতিয়াককে আসামি করে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য ছিল, গভীর রাতে অভিযানের সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করেন এবং পরে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন।

তবে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের ওই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ফুটেজে দেখা যায়, অভিযানটি দিনের বেলায় পরিচালিত হয় এবং ইশতিয়াকের পরনে ছিল লুঙ্গি। ভিডিওতে কয়েকজন ডিবি সদস্যকে তাকে মারধর ও তল্লাশি করতে দেখা যায়।

একপর্যায়ে এক সদস্যকে কিছু দূরে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে বলতে শোনা যায়, “এই যে এক টোপলা।”

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাদক মামলায় সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহা তদন্ত কমিটি এবং গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাস্থলে তারা উপস্থিত ছিলেন না। প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা অবস্থায় তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলে তারা দাবি করেন।

অন্যদিকে নিহতের মা খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৬৫ হাজার টাকা এবং পরে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। দাবি করা অর্থ নিয়ে ফরিদপুরে পৌঁছানোর পর তিনি জীবিত সন্তানের পরিবর্তে মরদেহ গ্রহণ করেন। তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি একই অভিযোগ লিখিতভাবে উপস্থাপন করেন।

ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আজম এবং জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি মোশাররফ হোসেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বলেন, “অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সদস্য কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিভাগীয় তদন্তে কার দায় কতটুকু, তা নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযান পরিচালনার সময়, মাদক উদ্ধারের দাবি, সাক্ষীদের ভূমিকা কিংবা অর্থ দাবির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঘটনার সময় ফরিদপুর ডিবির ওসির দায়িত্বে ছিলেন মো. আলমগীর হোসেন। অভিযানে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন এসআই আহাদুজ্জামান, এসআই মোতাহার আলী, এএসআই হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, রাকিবুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মিয়া, চম্পা হালদার এবং গাড়িচালক সবুজ মোল্লা। বিতর্কিত এ ঘটনার পর ওসিসহ সংশ্লিষ্ট ১১ পুলিশ সদস্যকে ফরিদপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়।