চুয়াডাঙ্গায় বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে নিম্নমানের চারা-বাঁশ বিতরণের অভিযোগ

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২১:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

  চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে চুয়াডাঙ্গায় নিম্নমানের চারা ও বাঁশের খুঁটি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। জেলার চার উপজেলায় কৃষক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা এসব উপকরণের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উপকারভোগীরা।

সরকারি বরাদ্দের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের পার্থক্য নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন তারা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। এর আওতায় চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায় বিভিন্ন প্রজাতির ২৫ হাজার চারা রোপণের পরিকল্পনা করা হয়। ইতোমধ্যে চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার বিতরণ এবং রোপণের কাজ শেষ হয়েছে।

উপকারভোগীদের অভিযোগ, প্রকল্পে প্রতিটি বাঁশের খুঁটির সরকারি মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সরবরাহ করা খুঁটিগুলো অপরিপক্ব ও নিম্নমানের। তাদের দাবি, এসব খুঁটির বাজারমূল্য ১৫ থেকে ২০ টাকার বেশি নয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির চারার সরকারি মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমড়া, জাম ও বেলের প্রতিটি চারার সরকারি মূল্য ৩০ টাকা, জলপাই ৪০ টাকা, খেজুর ৩০ টাকা এবং আম ও তাল ৬০ টাকা করে ধরা হয়েছে। অথচ সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসি থেকে এর চেয়ে কম দামে চারা কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ালগাছি ইউনিয়নের ধান্যঘরা-দুর্গাপুর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষকদের নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে চারা সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন ইউপি সদস্য শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, সরবরাহ করা চারা ও বাঁশের খুঁটির মান দেখে কৃষকরা সেগুলো নিতে রাজি হননি। পরে তিনি একাই চারাগুলো নিয়ে গ্রামের রাস্তার পাশে রোপণ করেন। এরই মধ্যে কয়েকটি চারা মারা গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

উপকারভোগীদের অভিযোগ, নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহের কারণে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তারা প্রকল্পের উপকরণ কেনাকাটা ও সরবরাহের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ চারা নিম্নমানের হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হর্টিকালচার থেকে ডিডি অফিসের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিসে চারা সরবরাহ করা হয়েছে। নিম্নমানের হওয়ায় প্রায় ৮০০টি চারা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

তবে কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন চুয়াডাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের নার্সারি তত্ত্বাবধায়ক আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, হর্টিকালচার সেন্টার থেকে নির্ধারিত মান অনুযায়ী চারা উৎপাদন ও সরবরাহ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে নিম্নমানের চারা সরবরাহের অভিযোগ সঠিক নয়।

দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। চারাগুলো লাগানোর পর জিপিআরএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরকার মনিটরিং করবে।

এদিকে জীবননগর উপজেলায় কৃষকদের মাঝে চারা বিতরণ করা হলেও বাঁশের খুঁটি বিতরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

পুরো প্রকল্পের মূল দায়িত্বে থাকা চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, টেন্ডার ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করেই চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার কেনা হয়েছে। সরবরাহ করা উপকরণের মানও ভালো বলে দাবি করেন তিনি। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব চারা ও বাঁশ ক্রয়ে কোনো ওপেন টেন্ডার করা হয়নি।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, বৃক্ষরোপণ প্রকল্প সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এখানে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় এবং উপকারভোগীদের মানসম্মত উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা হবে। প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং উপকরণের মান ঠিক আছে কি না, তা মনিটরিং করা হবে। যদি সঠিক মানের চারা ও বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করা না হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো পরিবর্তন করতে হবে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২৫ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যক্রম জিপিআরএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার কথা রয়েছে। তবে উপকারভোগীদের অভিযোগ, শুধু চারা বিতরণ ও রোপণ নয়, চারাগুলো যথাযথভাবে বেড়ে ওঠা এবং প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।