কমলগঞ্জে স্কুল শিক্ষিকা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২১:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে স্কুল শিক্ষিকা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রোজিনা বেগমকে (৩২) প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার এক বছর পর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

এ হত্যা মামলার প্রধান আসামী রেজাউল করিম সাগরসহ সব আসামী বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আসামীরা বাদীপক্ষকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন এবং মামলা আপস করার জন্যও প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন। এতে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার সুষ্ঠু বিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

গত বছরের (২৬ মে) উপজেলার ভাসানীগাঁও গ্রামে নৃশংসভাবে রোজিনা বেগমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন। ঘটনার রাতে নিহত শিক্ষিকার ভাই বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামী করে কমলগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোজিনা বেগম শুধু একজন স্কুল শিক্ষিকাই ছিলেন না, তিনি সিলেট আইন মহাবিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীও ছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রথম বর্ষের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে তিনি উত্তীর্ণ হন। পাশাপাশি তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা ছিলেন এবং পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন।

তিনি মাধবপুর ইউনিয়নের ভাসানীগাঁও গ্রামের নবদূত পাঠশালার (কেজি স্কুল) প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ও গ্রামের প্রয়াত নিজাম উদ্দীনের কনিষ্ঠ কন্যা। এলাকায় তিনি মানবিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যাপক পরিচিত ছিলেন এবং মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন। নিহত রোজিনার ১২ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঘটনার দিন সকালে ভেকু মেশিন দিয়ে কৃষিজমির মাটি কাটছিলেন স্থানীয় আব্দুর রহিম। খবর পেয়ে নিহত রোজিনার বোনজামাই জালাল মিয়া আপত্তিকৃত জমিতে মাটি কাটায় বাধা দেন। এ সময় প্রতিপক্ষ দা দিয়ে জালাল আহমেদের হাত-পায়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

পরে জালাল আহমদকে রক্ষা করতে হারুন মিয়া ও ছোট বোন শিক্ষিকা রোজিনা বেগম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় রেজাউল করিম সাগর ও তার বাবা আব্দুর রহিম ধারালো অস্ত্র দিয়ে রোজিনার ওপর আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এ ছাড়া আব্দুর রহিম, তার ছেলে রেজাউল করিম সাগর এবং তাদের সহযোগী মনির মিয়া ও আজিবুর রহমান পূর্বপরিকল্পিতভাবে দা ও বল্লম নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে প্রতিপক্ষের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালিয়ে জখম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোজিনা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অন্য তিনজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার পর থেকে আসামীরা আত্মগোপনে থাকলেও প্রধান আসামী রেজাউল করিম সাগর ছাড়া অন্য আসামীদের পুলিশ পর্যায়ক্রমে গ্রেফতার করে। পরে সাগর উচ্চ আদালত থেকে অস্থায়ী জামিন নেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে নিম্ন আদালতে হাজির করলে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। তিন মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

নিহত রোজিনা বেগমের বড় ভাই ও মামলার বাদী শাহজাহান আহমদ বলেন, "আমার নিরীহ বোন রোজিনাকে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে রেজাউল করিম সাগর ও তার বাবা আব্দুর রহিম। অন্য আসামীরা আমার ভাই ও বোনজামাইকে কুপিয়ে জখম করেছে।"

তিনি অভিযোগ করেন, "সব আসামী জামিনে বেরিয়ে এসে আমাদের পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, হত্যা মামলা আপস করার জন্য একের পর এক প্রস্তাবও পাঠাচ্ছে। এতে আমরা আতঙ্কে রয়েছি। নিরাপত্তার স্বার্থে কমলগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছি।"

তিনি আরও বলেন, "আসামীপক্ষের নানা কৌশল ও আইনি জটিলতায় যেন বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত না হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।"

এ বিষয়ে রোজিনা হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কমলগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক রনি তালুকদার বলেন, যথাযথ তদন্ত ও মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আশা করি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।