হারবা বিলের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে, সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৮ | অনলাইন সংস্করণ
কাউছার পারভেজ শাকিল, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক জলাশয় হারবা বিল। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি বিল নয়, বরং গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য অংশ।
বর্ষার মৌসুমে সকাল হলে দেখা মিলে শত শত দর্শনার্থীর। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ আসছেন দলবেঁধে বন্ধুদের নিয়ে। প্রতিটি সকাল পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
হারবা বিলের অপরূপ সৌন্দর্য, দৃষ্টি দূর পর্যন্ত জলের মাঠ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে বিলের জলে স্নান করতে। তাই কেউ নৌকা করে, কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়ে, কেউ সাঁতার কেটে পানকৌড়ির মতো ডুবডুব খেলায় উপভোগ করছেন এই বিলের শীতল ছোঁয়া।
যদিও হারবা বিলের উৎপত্তি বা ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত বা প্রাতিষ্ঠানিক দলিল পাওয়া যায়নি, তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক জলাভূমি হিসেবে টিকে আছে।
বিলটির চারপাশজুড়ে রয়েছে সবুজ গাছপালা, খোলা আকাশ এবং শান্ত জলরাশি। বর্ষা মৌসুমে বিলটি পূর্ণতা লাভ করে, আর শুষ্ক মৌসুমে এর ভিন্ন রূপ চোখে পড়ে। বছরের বিভিন্ন সময়ে এখানে নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জীবিকার অংশ হিসেবে এই বিলে মাছ শিকার করেন। আবার অনেকে অবসর সময়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে এখানে আসেন। বিকেলের শান্ত পরিবেশ, পাখির কলতান এবং নির্মল বাতাস হারবা বিলকে গ্রামীণ বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মেজ-বাবুল আলমের মতে, এ ধরনের প্রাকৃতিক জলাভূমি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পরিবেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে হারবা বিল ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনেরও সম্ভাবনাময় একটি স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
ময়মনসিংহ রিজিয়নের টুরিস্ট পুলিশ সুপার নাঈমুল হক বলেন, আমরা হারবা বিলে আসা সকল পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত টহল পরিচালনা করি। এই বিলে পর্যটকদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোনো রকমের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা অভিযোগ তুলে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো সংকুচিত হচ্ছে। হারবা বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হারবা বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় এটি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এ জলাভূমির সৌন্দর্য ও উপকারিতা উপভোগ করতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, হারবা বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে খুব আকৃষ্ট করে। তাই এ এলাকার লোকজন তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বিলটিতে বেড়াতে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুল বলেন, হারবা বিলে বছরে প্রায় ২ থেকে ৩ মাস পানি থাকে। এ সময়টিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে হাঁস পালন করলে গ্রামীণ পরিবারের জন্য এটি একটি লাভজনক আয়ের উৎস হতে পারে।
বিলে প্রাকৃতিকভাবে শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ খাদ্য পাওয়া যায়, ফলে খাদ্য ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। তবে রোগ প্রতিরোধে সময়মতো টিকা প্রদান, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরিচর্যা করা জরুরি। আগ্রহী খামারিরা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিয়ে হাঁস পালন শুরু করলে স্বল্প সময়েই ভালো অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি স্থানীয় পুষ্টি ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মোহাম্মদ আফজালুল হক (আফজাল) বলেন, হারবা বিলকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো হবে না। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখানে মৌসুমি মাছ চাষ, দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, ভাসমান সবজি চাষ, জলজ ঘাস ও পশুখাদ্য উৎপাদন, পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি, নৌকাভ্রমণ এবং বিলকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
এতে এলাকার বেকার যুবক, নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্যোক্তারা সমন্বিত উদ্যোগ নিলে হারবা বিলকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
ত্রিশাল বাগান এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, হারবা বিলে বেড়াতে এসে মনে হচ্ছে ঠিক যেন হাওরের দৃশ্য।
