কৃষিতে সাফল্যের পর গ্রামে স্কুল-কলেজ গড়ে দৃষ্টান্ত সানোয়ারের
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:০৪ | অনলাইন সংস্করণ
রঞ্জন কৃষ্ণ পণ্ডিত, টাঙ্গাইল

সফল কৃষক সানোয়ার। ব্যক্তি জীবনে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল থেকে পড়াশোনার জন্য তাকে যেতে হয় অনেক দূরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। আর সেই সময় থেকেই তার নিজের ভেতর একটি অদম্য স্পৃহা ছিল নিজের গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়ানোর। কিন্তু তার ছিল না অর্থবিত্ত।
তিনি প্রথমে বাবার কিছু জমি নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে কৃষির প্রতি তার মমত্ববোধ বাড়তে থাকে।
এরপর তিনি আশপাশের কিছু মানুষের জমি লিজ নিয়ে তার কৃষি খামারের সম্প্রসারণ করেন। ধীরে ধীরে হয়ে যান সফল কৃষক সানোয়ার। এখন মানুষ এক নামে সফল কৃষক সানোয়ারকে চিনে। কৃষক হিসেবে তিনি ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারও পেয়েছেন।
আর কৃষিতে সফলতা পাওয়ার পর শৈশব থেকে তিনি যে প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে অতিকষ্টে পড়াশোনার গণ্ডি পার করেছেন, সেই স্মৃতিগুলো তাকে বারবার তার নিজ গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে আগ্রহী করে তোলে। তার ভাবনা ছিল, মধুপুর উপজেলার মহিষমারা গ্রামটি একদিন মানুষের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠবে।
আর সেই চেতনা থেকেই তিনি নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন স্কুল ও কলেজ। তার গড়ে তোলা এ কলেজে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে কৃষি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। প্রথমে শিক্ষার্থীরা এটাকে ঝামেলা মনে করলেও পরবর্তীতে তারা মনে আনন্দ নিয়েই এ কৃষি শিক্ষাকে উপভোগ করে। স্থানীয় কিছু মানুষ একসময় সানোয়ারের এ উদ্যোগকে উপহাস করলেও এখন সানোয়ারের প্রতিটি উদ্যোগকে এলাকার মানুষ উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
দীর্ঘ সংগ্রাম আর দৃঢ় প্রত্যয়ে তিনি আজ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি কৃষি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতার দাবি, এই কলেজের লক্ষ্য শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা।
টাঙ্গাইলের মধুপুরে সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশে, পাখির ডাক আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ঘেরা প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী মহিষমারা কলেজ। ২০১৪ সালে মহিষমারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন মো. সানোয়ার হোসেন।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের চাকরিনির্ভর করে তুলছে, অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত স্বাধীন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ গড়ার মাধ্যম।
এই কলেজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একটি সমন্বিত কৃষি শিক্ষাকেন্দ্র। কলেজ ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন জাতের আনারসের বাগান, নানা জাতের কচুর চাষ, আদা ক্ষেত, ড্রাগন ফলের বাগান, বিদেশি কফি বাগান এবং বিভিন্ন ধরনের বনজ গাছের সমাহার। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে মাছের খামার, মাঠে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
এ ছাড়া সেখানে রয়েছে কৃষি উন্মুক্ত লাইব্রেরি, যেখানে কৃষি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও পরিবেশ বিষয়ক বই-পুস্তক সংরক্ষিত আছে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য রয়েছে খেলার মাঠ। একই ক্যাম্পাসে পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, চারা উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
সানোয়ার হোসেন বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে চাকরির দিকে ঠেলে দেয়। একজন শিক্ষিত মানুষ অন্যের অধীনে কাজ করতে চায়, স্বাধীনভাবে কিছু করতে চায় না। মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও আত্মনির্ভরশীল মানসিকতা বিকাশের জন্যই আমি এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি।
কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, ফসল উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে এবং ভবিষ্যতে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি সমাজকে উপহাসের হাসিটা ব্যাখ্যা করে বলেন, এত সুন্দর কাজ, কৃষিতে অনেক লাভ—এই জিনিসটা বাদ দিয়ে মানুষ অন্যের দিকে দৌড়ায়। তারুণ্যের শক্তিতে যদি দেশের মানুষগুলো উদ্বুদ্ধ হয়, তবে এ দেশের মাটিতে সোনার ফসল ফলবে। যারা আমাকে নিয়ে ট্রল করেছে, তারা এখন আমার সফলতায় ঈর্ষান্বিত। আবার কেউ কেউ আমার এই কৃষি কাজকে অনুসরণ করে সফলতা পাচ্ছে।
স্থানীয় যুবক আব্দুল কাদের বলেন, কলেজটি এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষিকে ঘিরে আত্মনির্ভরশীল প্রজন্ম গড়ার স্বপ্ন দেখছেন কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা সানোয়ার।
ওই কলেজের শিক্ষার্থী রুবেল বলেন, কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির এ উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে আমরাও উদ্যোক্তা হয়ে কৃষিকাজে কর্মসংস্থান তৈরি করব।
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে এবং দেশের কৃষি ও অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
