সাতক্ষীরায় জনবল সংকটে থমকে আছে চিংড়ি প্রদর্শনী খামারের ল্যাব
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৬:০৭ | অনলাইন সংস্করণ
শাহীন গোলদার, সাতক্ষীরা

দক্ষ ও কারিগরি জনবল সংকটের কারণে সাতক্ষীরার এল্লারচরে চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ল্যাবের কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় থমকে গেছে। জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত পিসিআর ল্যাব, হ্যাচারি ও কোয়ারেন্টাইন ল্যাবের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কোনো সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মৎস্য চাষিরা।
মৎস্য ঘের চাষিরা জানান, জেলায় চিংড়ি চাষিদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে রেণুর গুণগত মান ও ভাইরাস পরীক্ষার ল্যাব নির্মাণ করা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে প্রতিবছর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি মারা যাচ্ছে। চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত সাদা সোনা বা বাগদা চিংড়ির প্রধান হাব সাতক্ষীরা। তথ্যমতে, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজার ঘেরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাগদা চিংড়ি চাষ হয়, যেখানে প্রতি মৌসুমে ৩০০ কোটিরও বেশি চিংড়ি রেণু ছাড়া হয়ে থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে জেলার এল্লারচর এলাকায় অবস্থিত চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অত্যাধুনিক রেণু পরীক্ষা ও পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়।
তবে মৎস্য বিভাগের উদ্দেশ্য ছিল, ঘেরে ছাড়ার আগেই যেন চাষিরা পোনার গুণগত মান ও রোগ-জীবাণু পরীক্ষা করে নিতে পারেন। কিন্তু স্থাপনের পর থেকেই প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার স্পর্শকাতর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল এখন ধূলিবালি জমে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় ঘের মালিক শফিকুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, আব্দুর রহমানসহ একাধিক ঘের মালিকরা বলেন, উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবলের অভাবে তালাবদ্ধ পড়ে রয়েছে আধুনিক ল্যাব দুটি। তবে ল্যাব চালু না থাকায় চাষিরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন না।
তারা আরও বলেন, বাধ্য হয়ে খালি চোখে দেখে বাজার থেকে পোনা কিনে ঘেরে ছাড়ছেন তারা। এতে ভাইরাসবাহী বা দুর্বল পোনা ঘেরে চলে যাওয়ায় কিছুটা বড় হওয়ার পরপরই মড়ক দেখা দিচ্ছে এবং মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ঘের। টানা লোকসানের ধাক্কায় অনেক চাষি ইতোমধ্যে চিংড়ি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে ভাইরাসের এ তাণ্ডব যোগ হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য অর্থনীতি এখন চরম হুমকির মুখে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা বলেন, একের পর এক চালানে পুঁজি হারিয়ে অনেকেই এখন ভিটেমাটি বিক্রি করার উপক্রম। বাধ্য হয়ে অনেকে চিংড়ি ঘের বন্ধ করে সাধারণ সাদা মাছ বা ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, চিংড়ি শিল্পকে আধুনিক ও টেকসই করতে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামার। জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন ঘের মালিকরা।
তিনি আরও বলেন, দক্ষ ও কারিগরি জনবল সংকটের কারণে ল্যাবের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দক্ষ জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, রপ্তানিযোগ্য চিংড়ি উৎপাদন করে দেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে রেণুর ভাইরাস পরীক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে ল্যাব দুটি চালু না করলে একদিকে চাষিরা সর্বস্বান্ত হবেন, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার সরকারি যন্ত্রপাতিও অকেজো হয়ে পড়বে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার জি এম সেলিম বলেন, গবেষণা, উন্নত পোনা উৎপাদন, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে সেই স্বপ্ন এখন থমকে গেছে।
প্রদর্শনী খামারের দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানান, তারা চাষিদের কোনো পরামর্শ দিতে পারছেন না। জনবল চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান জেলা মৎস্য বিভাগ।
দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ করে পিসিআর ল্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাতক্ষীরাবাসীর।
