বরগুনা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নাজুক, ভোগান্তিতে পৌরবাসী
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২০:২১ | অনলাইন সংস্করণ
বরগুনা প্রতিনিধি

বরগুনা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে নাগরিকদের মধ্যে। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ না করা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও কমিউনিটি কন্টেইনারের সংকট, নির্ধারিত সময়ে ময়লা অপসারণ না হওয়া এবং বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় আবর্জনা পড়ে যাওয়ায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধের পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রবও বাড়ছে।
সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে দলগত আলোচনায় উঠে এসেছে, বরগুনা পৌর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্র অত্যন্ত নাজুক। নাগরিকদের অভিযোগ, পৌরসভার বর্তমান উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। শহরের সদর রোড, ডিসি অফিস থেকে স্টাফ কোয়ার্টার এবং বাজার সড়কের কিছু অংশে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দেখা গেলেও অধিকাংশ সড়ক ও অলিগলিতে নিয়মিত নজরদারি নেই। ফলে বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং অনেক ডাস্টবিন উপচে পড়ছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলেও এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ পর্যাপ্তভাবে অবহিত নন। সচেতন মহলের কেউ কেউ অভিযোগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে আবাসিক এলাকার বাসাবাড়িতে বর্জ্য রাখার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করেছিল পৌর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা কার্যকর নেই। ফলে অনেক পরিবার নিজেদের সুবিধামতো স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন। বিভিন্ন কালেকশন পয়েন্ট ও কমিউনিটি কন্টেইনারের আশপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্য, দুর্গন্ধ এবং মশা-মাছির উপদ্রব দেখা যায়। কোনো কোনো স্থানে দুর্গন্ধের কারণে পথচারীদের চলাচলেও ভোগান্তি হচ্ছে। বৃষ্টি ও গরমের সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
পৌর এলাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় ডাস্টবিন, কমিউনিটি কন্টেইনার ও বর্জ্য সংগ্রহের পয়েন্টও পর্যাপ্ত নয়। ফলে অন্যান্য নাগরিক সেবার তুলনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মান অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করছেন নাগরিকরা।
বর্জ্য পরিবহন ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। নিয়মিত বর্জ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় ময়লা পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। নাগরিকদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে পৌর শহরের বর্জ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ ১৬টি গাড়ি কার্যকর রয়েছে। অথচ একসময় ২২টি গাড়ি কার্যকর ছিল। পৌর কর্তৃপক্ষ জনবল সংকটকেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাগরিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ডেঙ্গু, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি কার্যক্রমও নাগরিকদের কাছে দৃশ্যমান নয়। অভিযোগের পরিমাণ অনেক হলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের হার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি এনজিওর কার্যক্রম থাকলেও তা বর্তমানে অনেকটা নামকাওয়াস্তে চলছে বলে অভিযোগ করেছেন নাগরিকরা। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের মতামত গ্রহণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, “একটি আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব শহরের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বরগুনা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সমস্যা চিহ্নিত করে জনবল, যানবাহন, ডাস্টবিন, নিয়মিত সংগ্রহ ও অপসারণ এবং তদারকি ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।”
নাগরিকদের দাবি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন নিশ্চিত, প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও কমিউনিটি কন্টেইনার স্থাপন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ এবং নাগরিক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে বরগুনা পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান হবে না।
