ফরিদপুরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

  ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক প্রসূতির পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের ৫১ দিন পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার অভিযোগ এনে দায়ীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন নিহতের স্বামী।

নিহত কনিকা মণ্ডল (৩০) রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। গত ১৯ আগস্ট দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি ৫১ দিন বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।

নিহতের স্বামী অশান্ত মণ্ডল জানান, গত ২৯ জুন অসুস্থ হয়ে পড়লে তার স্ত্রী কনিকাকে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে ওই দিন সন্ধ্যায় সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন কনিকা।

অশান্তের অভিযোগ, অপারেশনের পরদিন থেকেই কনিকার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও তিনি গুরুত্ব দেননি বলে দাবি করেন অশান্ত। পরে কনিকাকে ফরিদপুরের কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার শারীরিক অবস্থার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।

পরিবারের ভাষ্য, পরে গত ৩ জুলাই কনিকাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা কনিকের পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত করেন বলে দাবি পরিবারের।

অশান্ত মণ্ডল বলেন, একই দিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কনিকের পেট থেকে গজ-ব্যান্ডেজ বের করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯ আগস্ট দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

অশান্তের দাবি, ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একটি বার্তায় কনিকের চিকিৎসায় ভুল হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ওই বার্তায় চিকিৎসক লেখেন, ‘দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোরে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়... আমি ভুল করে ফেলেছি... আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।’

অশান্ত মণ্ডল বলেন, ‘আমার স্ত্রীর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার কারণেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সে মারা গেল। এখন ৫১ দিনের শিশুটিকে আমি কীভাবে মা ছাড়া বড় করব? আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার চাই।’

তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির মুজিব সড়কে অবস্থিত সমরিতা হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চিকিৎসক সেখানে ছিলেন না। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

এরপর ঝিলটুনির টেরাকোটা সংলগ্ন অচিন্ত্য টাওয়ারে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সেখানে দারোয়ান নাইম মোল্লা জানান, চিকিৎসক বাসায় রয়েছেন। তবে তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহশিন শরীফ বলেন, ‘আমার হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন, এর আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই ঘটনার ওই নারী মারা গেছেন।’

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমি বিষয়টি আগে জানতাম না। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিহতের পরিবারের অভিযোগের সত্যতা, চিকিৎসায় প্রকৃতপক্ষে কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুল হয়েছিল কি না এবং কনিকার মৃত্যুর সঙ্গে অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ-ব্যান্ডেজ থাকার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।