
প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ করায় আর্থিক চাপে পড়েছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) সাধারণ মানুষ। এই চাপের ফলে অতি দারিদ্র্যের কারণে অনেকে জমি বিক্রি করতে না পারায় চিকিৎসা করাতে পারছেন না। আবার অনেকে সন্তানের বিয়েও দিতে পারছেন না।
পাশাপাশি সাধারণ ভূমি মালিকরা বৈধ ভূমি হস্তান্তর কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এর ফলে এক বছরের ব্যবধানে দলিল নিবন্ধন কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। এই উৎসে কর স্থগিত বা বাতিল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শরণাপন্ন হয়েছেন রসিক প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী। দু-এক দিনের মধ্যে তিনি এনবিআর চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে চিঠি দেবেন।
প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, সিটি করপোরেশনে নবসংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ৭৯টি মৌজাকে পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ঘোষিত বাণিজ্যিক, আবাসিক বা শিল্প প্লট বহির্ভূত ‘চ’ শ্রেণির জমির হস্তান্তর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভূমি উৎস কর শতকপ্রতি সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা আওতামুক্ত রাখার অনুরোধ করছি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ৫ জুলাই জারিকৃত গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রসিক এলাকায় ‘চ’ শ্রেণির জমি হস্তান্তর/বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি শতাংশ জমির বিক্রয়মূল্যের ৩ শতাংশ অথবা সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা, যা অধিক, উৎসে কর হিসেবে আদায়ের বিধান কার্যকর করেছে।
তিনি বলেন, পুরোনো এনবিআর চেয়ারম্যানের সময়ে যে গেজেট হয়েছে, তা অমানবিক এবং বাস্তবসম্মত নয়। আশা করি, নতুন চেয়ারম্যান এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন।
রসিক প্রতিষ্ঠাকালে ১৫টি ওয়ার্ডের আওতায় মোট ৩৬টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে আরও ৭৯টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সিটি করপোরেশনের এসব এলাকার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, উল্লিখিত ৭৯টি মৌজার অধিকাংশ এখনও কৃষিনির্ভর, গ্রামীণ ও সীমিত অবকাঠামোগত সুবিধাসম্পন্ন এলাকা হিসেবে বিদ্যমান। এসব এলাকায় নগরায়ণের প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক স্থাপনা, আবাসন উন্নয়ন এবং অন্যান্য নগর সুবিধার সম্প্রসারণ এখনো শুরু হয়নি।
ফলে এসব এলাকায় ভূমির বাজারমূল্য পুরোনো নগরাঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শতাংশপ্রতি ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ পরিবেশ ও অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে সিটি করপোরেশন এসব এলাকা থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতি শতাংশে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর আরোপ ভূমির প্রকৃত বাজারমূল্য, স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কর প্রদানের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে সাধারণ ভূমি মালিকরা অতিরিক্ত আর্থিক চাপে পড়ছেন এবং বৈধ ভূমি হস্তান্তর কার্যক্রম নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
রংপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নবসংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ৭৯টি মৌজায় ২০২৪ সালে মোট ২ হাজার ৭৮১টি দলিল নিবন্ধিত হলেও ২০২৫ সালে তা হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৭৪৯টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩২টি দলিল কম নিবন্ধিত হয়েছে, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী বলেন, এই পরিসংখ্যান সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে যে, বিদ্যমান উৎসে কর কাঠামো সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি লেনদেন ও নিবন্ধন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। অতি দারিদ্র্যের কারণে জমি বিক্রি না হওয়ায় অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিয়েও হচ্ছে না।
কর প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিক করের ফলে ভূমি লেনদেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং নিবন্ধন কার্যক্রম হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব বৃদ্ধির পরিবর্তে রাজস্ব আহরণের ভিত্তিই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভূমি বাজারে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
সিটি প্রশাসক বলেন, এমন অবস্থায় রসিকের পূর্ববর্তী ১৫টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত ৩৬টি মৌজার ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎসে কর ব্যবস্থা বহাল রাখা যেতে পারে। তবে নবসংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত উল্লিখিত ৭৯টি মৌজাকে একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ শ্রেণিভুক্ত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণ না হওয়া পর্যন্ত বা পরবর্তী ৫ বছরের জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ঘোষিত বাণিজ্যিক, আবাসিক বা শিল্প প্লট বহির্ভূত ‘চ’ শ্রেণির জমির হস্তান্তর নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শতকপ্রতি সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা উৎসে কর আদায়ের বিধান বাতিল/স্থগিত করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
এ ধরনের অঞ্চলভিত্তিক ও বাস্তবমুখী করনীতি একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকের ওপর আরোপিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ আর্থিক চাপ হ্রাস করবে, অন্যদিকে ভূমি হস্তান্তরের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আহরণের ভিত্তিকে আরও সম্প্রসারিত ও টেকসই করবে বলেও জানান রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী।