মতলব উত্তরে দেড় মাসে ১৯ ট্রান্সফরমার চুরি
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৬, ২১:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ
চাঁদপুর প্রতিনিধি

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত দেড় মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৯টি ট্রান্সফরমার চুরির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
এর মধ্যে একই রাতে পাশাপাশি দুটি এলাকায় চারটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দিবাগত রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি ও জীবগাঁও থেকে দুটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন গ্রাহকেরা। চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এতে নিম্নআয়ের গ্রাহকদের অনেকে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পেরে দিনের পর দিন বিদ্যুৎবিহীন থাকছেন।
তবে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. ওয়াহিদুজ্জামানের হিসাবে, চলতি বছরে এ জোনের আওতাধীন এলাকায় মোট ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ১৩টি এবং আগস্টে আরও ৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। গত ৩১ জুলাই দিবাগত রাতে উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নাউরি ও ফৈলাকান্দি এলাকায় পাশাপাশি স্থানে এক রাতেই চারটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
সকালে স্থানীয় গ্রাহকেরা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে চুরির আলামত দেখতে পান। এর আগে দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রাম, সুলতানাবাদ ইউনিয়নের দাসের বাজারসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে বিলম্ব হওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে গ্রাহকদের।
সর্বশেষ ২০ আগস্ট রাতে ছেংগারচর পৌর এলাকার দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের বাইতুননুর জামে মসজিদের পাশের বিদ্যুতের খুঁটি থেকে একটি ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে জীবগাঁও গ্রামের দক্ষিণ দিকে ইব্রাহীম আখনের বাড়ির সামনে থেকেও আরেকটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়।
দেওয়ানজীকান্দির ঘটনায় বাইতুননুর জামে মসজিদসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মসজিদের সাধারণ সম্পাদক বোরহানউদ্দিন ডালিম বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় মসজিদের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এতে মুসল্লিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। দ্রুত নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় গ্রাহক তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল হান্নান ও শুক্কুর আলী বলেন, এলাকার অধিকাংশ মানুষই নিম্নআয়ের। ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দেওয়ার শর্ত তাঁদের জন্য বড় চাপ। টাকা জোগাড় করতে না পারায় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো এলাকায় প্রথমবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক টাকা গ্রাহকদের বহন করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার পরে আবার চুরি হলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১০ কেভিএ ক্ষমতার একটি ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ফলে চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমারের টাকা জোগাড় করা নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রের ধারণা, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার কয়েল ও কেবলই চোরদের মূল লক্ষ্য। ট্রান্সফরমার খুলে নেওয়ার পর এর ভেতরের তামার তার ও অন্যান্য মূল্যবান অংশ খুলে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম বলেন, যারা ট্রান্সফরমার চুরি করছে, তারা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞ। কারণ লাইনে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায়ও তারা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে তারা ধারণা করছেন। চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যন্ত ও নির্জন স্থান থেকে ট্রান্সফরমার চুরি করছে। পরে সেগুলো ভাঙারি পট্টিতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
তিনি বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রাহকদের সচেতন করতে প্রত্যন্ত এলাকায় মাইকিং, উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানিও করা হচ্ছে।
তবে লোডশেডিং চোরদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে বলে মনে করেন এই বিদ্যুৎ কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক গ্রাহক সেটিকে স্বাভাবিক লোডশেডিং মনে করেন। এই সুযোগেই চোরেরা ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অ্যালার্মিং’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রাহকদের সচেতন করা ছাড়া এটি মোকাবিলার বিকল্প নেই।
মতলব উত্তর জোনে বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, জোনাল অফিস নিজস্বভাবে সংকট তৈরি করে না। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। মতলব উত্তরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৭ মেগাওয়াট হলেও কখনো ৮, কখনো ১০, ১২ কিংবা ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোড নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
গ্রাহকদের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা এবং তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ইচ্ছা করলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। ‘গ্রাহক যেমন বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে আছেন, আমরাও এর বাইরে নই। আমরাও অন্ধকারে থাকি।’
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ইদানীং ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে এবং রাতে টহল বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, এলাকাবাসীকেও সচেতন হতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির চলাফেরা দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
