কাউখালীতে নির্ধারিত এলাকার বাইরে বিয়ে নিবন্ধনের অভিযোগ

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৬:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় সরকারি বিধি-বিধান উপেক্ষা করে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের অভিযোগ উঠেছে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) বিরুদ্ধে। সরকারি বালাম বইয়ের পরিবর্তে কথিত ডুপ্লিকেট রেজিস্টার ব্যবহার, নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বিবাহ নিবন্ধন, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সরকারি রসিদ না দেওয়া এবং সময়মতো কাবিননামার নকল না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে আইনি ঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে নিকাহ নিবন্ধন করার সুযোগ নেই। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, কাউখালীর কয়েকজন নিকাহ রেজিস্ট্রার নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বিবাহ নিবন্ধন করছেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিবাহ নিবন্ধনের সময় বর-কনের বয়স ও পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে সরকারি বালাম বই ব্যবহার নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে সরকারি রসিদ দেওয়ার পর বিবাহের তথ্য সংশ্লিষ্ট বালাম বইয়ে লিপিবদ্ধ করার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু কাজী সরকারি বালাম বইয়ের পরিবর্তে বাজার থেকে কেনা ডুপ্লিকেট রেজিস্টারে বিবাহের তথ্য লিখে রাখছেন।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই বিবাহ নিবন্ধনের পর তাদের সরকারি রসিদ দেওয়া হয় না। এমনকি কাবিননামার নকল কপিও সময়মতো দেওয়া হয় না। পরে পারিবারিক বিরোধ বা অন্য কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে বালাম বই থেকে বিবাহের নকল তুলতে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বিবাহের কোনো তথ্যই সরকারি খাতায় নেই।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মুখে ফেলছে না, একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাউখালী উপজেলার সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, পাঁচটি ইউনিয়নে পাঁচজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থাকার কথা। এর মধ্যে ৪ নম্বর ইউনিয়নের কাজী অবসরে যাওয়ায় সদর ইউনিয়নের কাজীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিয়ালকাঠি ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে এলাকায় নিয়মিত অবস্থান না করেও তাঁর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এমনকি তাঁর নামে কয়েকজন কথিত ভুয়া কাজী বিভিন্ন এলাকায় বিবাহ নিবন্ধনের কাজ করছেন এবং এসব লেনদেনের একটি অংশ তিনি গ্রহণ করেন—এমন অভিযোগও করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিকাহ রেজিস্ট্রার।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক কাজে তিনি নারায়ণগঞ্জে থাকলেও তাঁর কাজী অফিসের কার্যক্রম যথাযথভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। অফিস সহায়ক হিসেবে মাওলানা শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি কাগজপত্র সরকারি বিধি অনুযায়ী পরিচালনা করেন। নিয়মিত অফিসে এসে বালাম বইয়ে স্বাক্ষর করার দাবিও করেন তিনি।

সীমানার বাইরে নিবন্ধনের অভিযোগ

কাউখালীর ১ নম্বর সয়না-রঘুনাথপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে বিবাহ নিবন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেন, সরকারি রসিদ বা মেমো দেন না এবং সময়মতো কাবিননামার নকল সরবরাহ করেন না। এছাড়া কথিত ভুয়া বালাম বই বা রেজিস্টারে বিবাহ নিবন্ধনের অভিযোগও রয়েছে।

কাউখালী সদর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে চারজন কাজী বর্তমানে আছেন। ১ নম্বরে হাফিজুর রহমান, ২ নম্বরে কাজী আব্দুল্লাহ, ৩ ও ৪ নম্বরে মাওলানা শফিকুল ইসলাম এবং ৫ নম্বর ইউনিয়নে মাওলানা রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন। এদের বাইরেও কিছু লোক ভুয়া বই নিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, অধিকাংশ কাজী সরকারি বিধান যথাযথভাবে মানছেন না। এ বিষয়ে তাঁর কাছে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি দাবি করেন।

এদিকে, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন নিয়েও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো বিবাহের রেজিস্ট্রির তারিখ বা তথ্য অনুসন্ধানের জন্যও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। তালাক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। অথচ কাজী অফিসগুলোতে সরকার নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য খরচের তালিকা দৃশ্যমানভাবে টানানো নেই বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সরকারি বালাম বই এড়িয়ে কথিত ডুপ্লিকেট রেজিস্টারে বিবাহ নিবন্ধনের সুযোগ থাকলে প্রতিবছর সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে বালাম বইয়ে বিবাহের তথ্য না থাকলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকার, দেনমোহর, বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা অন্যান্য আইনি বিষয়ে ভুক্তভোগীদের চরম সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন গ্রিন ফোর্স বাংলাদেশের কাউখালী উপজেলা শাখার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জহুরুল ইসলাম বলেন, সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা এবং সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি আইন ও বিধি অনুযায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রারদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ বিষয়ে প্রায় এক সপ্তাহ আগে কাজীদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট কাজীদের বাইরে ভুয়া বালাম বা ভুয়া রেজিস্টার ব্যবহার করে কেউ অবৈধভাবে বিবাহ নিবন্ধনের চেষ্টা করলে তাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারি বালাম বই ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

পাশাপাশি সরকারি নির্ধারিত ফি, রসিদ প্রদান এবং কাবিননামার নকল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।