রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ
কক্সবাজার অফিস

রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছরে এসে দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তার তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিও ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের স্থানীয়করণ বিষয়ে সিএসও-এনজিও ফোরামের লিখিত গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিচালনা করলেও মানবিক কার্যক্রমের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। ফলে স্থানীয়করণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী উখিয়া, টেকনাফ ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রায় নয় বছর ধরে চলমান এই সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর ক্রমেই বাড়ছে চাপ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তার জন্য তহবিলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় এনজিওগুলো এখনো স্থানীয়করণ রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে বিপুল অর্থ থাকলেও স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে সরাসরি তহবিলের প্রবাহ খুবই সীমিত।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব সর্বাধিক ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে আন্তর্জাতিক এনজিও, জাতীয় এনজিও এবং স্থানীয় এনজিও—প্রতিটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৫ শতাংশ করে।
ফলে রোহিঙ্গা মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো মূলত আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক অংশীজনদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫ দশমিক ৬ লাখ মানুষকে সহায়তার জন্য প্রয়োজন ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে রয়েছে ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ তহবিল। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কাছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জাতীয় এনজিওগুলোর কাছে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ তহবিল রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য সরাসরি কোনো তহবিল নেই।
সিএসও-এনজিও ফোরামের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। দীর্ঘদিনেও টেকসই প্রত্যাবাসনের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের ওপরই বাড়ছে চাপ।
অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় মানবিক সহায়তার পরিমাণও কমছে। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তাসহ মৌলিক সেবায় আরও সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয়করণ জোরদারের জন্য গবেষণায় ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশগুলো হলো—প্রথমত, মানবিক সাড়াদান কার্যক্রমের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে স্থানীয় নেতৃত্ব ও কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে; স্থানীয় ও জাতীয় সংগঠনের বিকল্প হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, সব সেক্টরে স্থানীয় এনজিওগুলোর কো-লিডারশিপ চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য সরাসরি তহবিল বৃদ্ধি করতে হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, পুলড ফান্ডিং ব্যবস্থার সংস্কার করে ২০২৬ সালের পরবর্তী বরাদ্দে ব্র্যাক ও ইউএনওসিএইচএ-এর মাধ্যমে স্থানীয় সংগঠনগুলোর জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ সরাসরি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনদের মধ্যে সমতাভিত্তিক ও পারস্পরিক জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তমত, রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশভিত্তিক একটি পৃথক স্থানীয়করণ কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
অষ্টমত, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
নবমত, স্থানীয়করণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরির জন্য কার্যকর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দশমত, মানবিক সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় এনজিও নেটওয়ার্কগুলোর ভূমিকা স্বীকৃতি, শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক ও কক্সবাজার টিম লিডার জাহাঙ্গীর আলমের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী, কক্সবাজার সিটিজেন রাইট ফোরামের সভাপতি নাছির উদ্দিন, অধিকার বাংলাদেশ সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোসাইন, অগ্রযাত্রা সংস্থার হেলাল উদ্দিন, রোকেয়া ফাউন্ডেশনের আনজুমান আরা বেগম, ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন ও নুরুল কবিরসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও সাংবাদিকবৃন্দ।
