রংপুরে একই পরিবারের ৪ খুন, আদালতে দায় স্বীকার দুজনের

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৪০ | অনলাইন সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় সংঘটিত চাঞ্চল্যকর চার খুন মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানাতে প্রেস ব্রিফিং করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবুল মাবুদ।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত এ প্রেস ব্রিফিংয়ে মামলার তদন্তের অগ্রগতি, উদ্ধারকৃত আলামত এবং পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করা হয়। এ ঘটনায় ফরেনসিক, ময়নাতদন্ত ও জবানবন্দিতে ধর্ষণ হয়নি বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

আদালতে জবানবন্দিতে হত্যার বর্ণনা

আদালতের জবানবন্দি সূত্রে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস তাদের বন্ধু সীমান্ত দাসের বাড়িতে ৩টা ইয়াবা সেবন করেন। পরে ওই রাতেই মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর কাছে আরও কয়েকটি ইয়াবা নিয়ে দেবুর নির্মাণাধীন ভবন হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন।

দেবুর বাড়ির ছাদ খোলামেলা হওয়ায় বাতাসের কারণে ইয়াবা সেবনে সমস্যা হচ্ছিল। অন্যদিকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে হাফ ওয়াল থাকায় ইয়াবা সেবনে সুবিধা ছিল। এর আগেও তারা ওই ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করেছেন।

ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোর হয়ে যায়। ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে হাঁটাহাঁটির জন্য ছাদে গিয়ে দেখেন, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস ইয়াবা সেবন করছেন। এ নিয়ে তিনি তাদের ধমক দিয়ে চিৎকার করেন।

ইয়াবা সেবনের বিষয়টি সমাজে জানাজানি হওয়ার ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীকেই মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত থেকে গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই তাকে হত্যা করেন তারা। এ সময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।

ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়ে ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী। এ সময় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস দুজনে প্রীতিলতা ও আগামীকে ধরে ফেলেন এবং প্রীতিলিতাকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরে শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আগামীকেও হত্যা করেন।

এরপর লাশগুলো যাতে দেবুর ছাদ থেকে দেখা না যায়, এজন্য প্রীতিলতা ও আগামীকে টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে আসা হয়। এরই মধ্যে ওই বাড়ির ছোট ছেলে ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তীর ঘুম ভেঙে যায়। এ সময় সিদ্ধার্থকে দেখে আয়ুস বলে, ‘দাদা, তুমি এখানে কেন?’ এ কথা বলার পরপরই তাকেও দুজনে ধরে হত্যা করেন।

পরপর চারজনকে হত্যার পর তারা দুজনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এজন্য তারা দুজনে গোসল করেন। পরে তাদের কাছে থাকা একটি ইয়াবা সেবন করেন। এ সময় তারা খেজুর ও শসা খান।

পরে হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার জন্য বাড়িতে ভাঙচুর ও এলোমেলো করেন। এ সময় স্বর্ণের গহনা ও ১৫ হাজার টাকা পান তারা। স্বর্ণ আসল না নকল সেটিও পরীক্ষা করে দেখেন তারা।

বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সন্দেহে ছাদ থেকে পাওয়া একটি প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে দুপুরের দিকে ছাদ টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান তারা।

হত্যার কারণ অনুসন্ধান করছে পুলিশ

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ সমাজের মানুষ ছিলেন। আর মাছুয়াপাড়ায় অধিকাংশই দাস জাতের মানুষ বসবাস করতেন। প্রতিবেশী সিদ্ধার্থরাও দাস ছিলেন। ব্রাহ্মণ সমাজের হওয়ায় তিনি খুব একটা মিশতেন না দাস জাতের সঙ্গে।

এছাড়াও গণপতি চক্রবর্তী বেশি টাকা দিয়ে সিদ্ধার্থ দাস পরিবারের পূর্বের লোকজনের কাছ থেকে জমি কিনেন। গণপতি চক্রবর্তী জমির পুরো টাকা পরিশোধ করলেও সেই জমির টাকার ভাগ শরিক হিসেবে কম পেয়েছেন বলে জানা গেছে। হত্যার ঘটনায় এসব কারণ রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, যখন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরছিলেন, সেই সময়ে তারা চিৎকার করছিলেন। এই চিৎকার প্রতিবেশীরা শুনলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি।

এরই মধ্যে একজন বৃদ্ধা নারী চিৎকার শোনার কথা বললেও পরবর্তীতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে তিনি আর এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি।

যেভাবে জানাজানি ও লাশ উদ্ধার

গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পেরে গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী শনিবার রাত ৯টার দিকে বাসার সামনে আসেন। এ সময় দরজায় তালাবদ্ধ এবং বাড়িতে অন্ধকার দেখতে পান।

এরপর প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং একটি কক্ষের ভেতর থেকে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ সময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ ও ছড়ানো-ছিটানো ছিল।

যেভাবে গ্রেফতার হয় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাস

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ চারজনকে হত্যার পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাস সুযোগ বুঝে ছাদ টপকে দুজনে বাসায় যায়। ওই বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা মুগ্ধ দাস নিয়ে যান এবং গহনা সিদ্ধার্থ দাস নেন। সিদ্ধার্থ দাস গহনাগুলো তার কাকার বাসার পশ্চিমে সন্ধ্যার দিকে লুকিয়ে রাখেন।

এরই মধ্যে মুগ্ধ দাসের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার টাকা নিয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর কাছে রাখা মোবাইল উদ্ধার করে পুলিশ।

লাশ উদ্ধারের পর বিভিন্ন সোর্স, মোবাইল উদ্ধার, রাতে ইয়াবা কেনা ও ইয়াবা সেবনের আলামত এবং পারিপার্শ্বিক বিষয় তদন্ত সাপেক্ষে এলাকায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পরে মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান তিনি। এ সময় মুগ্ধ দাস শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।

এ সময় মুগ্ধ দাস কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের কাছে গণপতি চক্রবর্ত্তীসহ চারজনকে খুনের কথা বলেন। এ কথা শুনে বিদ্যুৎ দাস তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরই মধ্যে পুলিশ সেখানে গিয়ে হাজির হন এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস দুজনই মামাতো-ফুফাতো ভাই। সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে এবং মুগ্ধ দোকানে কাজ করতেন। সিদ্ধার্থ দাস আগে ইয়াবা সেবন করতেন না। গত এক মাস থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ইয়াবা সেবন করতেন।

তার ভাইয়ের বাড়িতে পর গত ছয় মাস থেকে সিদ্ধার্থ দাস তার চাচা বিজয় দাসের বাড়িতে রাতে থাকতেন। মাঝে মাঝে বন্ধু সীমান্ত দাসের বাড়িতেও থাকতেন।

স্বর্ণের গহনা উদ্ধার ও আলামত সংরক্ষণ

সিদ্ধার্থ দাসকে আটকের পরপরই লুকিয়ে রাখা গহনা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও লাশ উদ্ধারের সময়ই প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ পরিবারের চার খুনের ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন মহানগর কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) মিলন চন্দ্র চক্রবর্তী। পরে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জনিাত আলীকে তদন্তভার প্রদান করা হয়।

অধিকতর তদন্ত ও দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার জন্যই তদন্ত সংস্থা বদল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে পুরাতন ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তাই ঘটনাস্থল মাছুয়াপাড়ার বাড়ি পরিদর্শন করেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য

রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।

তবে চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও কেমিক্যাল ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। এছাড়া ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস।

তারা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

ডোপ টেস্ট

একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবুল মাবুদ। ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

সাক্ষীর জবানবন্দি

এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু সীমান্ত দাস এবং শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের সাক্ষ্যগ্রহণ আদালতের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

দুজনের সাক্ষীর সঙ্গে গ্রেফতার অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যে মিল রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার।

তদন্তের দায়িত্ব পেল ডিবি, বিচারের দাবিতে উত্তাল রংপুর

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে রংপুর জেলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ও শোক মিছিল কর্মসূচি পালন করেছেন।

একই সময়ে তারা রংপুরের পুলিশ প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিন দিনের আলটিমেটাম বেঁধে দিয়েছিলেন। এছাড়াও সুশাসন, মহানগর নাগরিক কমিটিসহ কয়েকটি সংগঠন মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, মোমবাতি প্রজ্বলনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী আদিতে রংপুর শহরের মানুষ নন। তবে তিনি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার মর্জিয়াপুর এলাকার মানুষ ছিলেন। তিনি গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট হয়ে রংপুর জেলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

গণপতি চক্রবর্তী প্রায় ২০১০ সালের দিকে মাছুয়াপাড়ায় জমি কেনেন এবং বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন ২০২৩ সালের দিকে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকার পর সম্প্রতি নির্মাণাধীন বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন।

স্নাতকোত্তর পাস ছিলেন আগামী চক্রবর্তী। চাকরি ও বিয়ের বিষয়ে আলোচনা চলছিল তার। বিয়ে ঠিকও হয়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। আয়ুস চক্রবর্তী পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন রংপুর জেলা স্কুলের।