ভ্যানিলাসহ সমন্বিত কৃষি খামার করে সফল দর্শনার হুমায়ুন

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

  চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

কৃষিতে বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া এনে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনিপাড়ার হুমায়ুন কবীর ফরাজী (৫১)।

সাধারণ সবজি ও ফল চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো ‘ভ্যানিলা’ চাষ করে তিনি এলাকায় সাড়া ফেলেছেন।

চার বছর নিবিড় পরিচর্যার পর এবার ভ্যানিলার গাছে ফুল থেকে ফল ধরেছে। বরবটির মতো দেখতে বিদেশি এ ফল দেখতে অনেকেই ভিড় করছেন তার খামারে। হুমায়ুন কবীর তার সমন্বিত খামারের নাম দিয়েছেন ‘নিউ কামাল এগ্রো’।

১৮ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে সমন্বিত কৃষি খামারটি। বর্তমানে তার খামারে চাষ হচ্ছে ভ্যানিলা, কাশ্মীরি কলা, পেঁপে ও ড্রাগন ফল। এছাড়াও পালন করা হচ্ছে ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ও গরু।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দর্শনা থানার বেগমপুর গ্রামের মৃত কামাল উদ্দীন ফরাজী ও রাশেদা বেগমের পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে সেজো ছেলে হুমায়ুন কবীর। তিনি দুই সন্তানের জনক।

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বেগমপুর কলোনিপাড়া গ্রাম। গ্রামের রাস্তার ধারে হুমায়ুনের ‘নিউ কামাল এগ্রো’ খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারের এক প্রান্তে থাকার জন্য দুটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এর এক পাশে ডেইরি খামার এবং আরেক পাশে দুম্বা, ছাগল ও ভেড়ার খামার। আরও একটু সামনে এগোলেই ভ্যানিলা বাগান। ১০ কাঠা জায়গা নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। জায়গাটি কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। নেটের ভেতরে ৬০০ থেকে ৭০০ পিলারে লতায়-পাতায় ঝুলছে ভ্যানিলা গাছ। গাছের আগার দিকে ঝুলছে ভ্যানিলা ফল। প্রতিটি ফল ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি লম্বা।

অনেকটা বরবটি সবজির মতো দেখতে সবুজ রঙের ভ্যানিলা ফল। আর কিছুদিন পর হালকা বাদামি রং ধারণ করলে গাছ থেকে ফলটি তোলা যাবে। ভ্যানিলা বাগানের পাশে রয়েছে ড্রাগন ও কাশ্মীরি কলা।

বাসসের সঙ্গে আলাপচারিতায় হুমায়ুন কবীর জানান, কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘদিন আম এবং নানারকম ফলের ব্যবসা করেছেন। ঢাকার কাওরান বাজারে তার বাবার ‘কুষ্টিয়া ভান্ডার’ নামে একটি ফলের আড়ত রয়েছে। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০ বছর আগে তিনি নিজেই আধুনিক ফল চাষে নামার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকেই তিনি নিজ জেলায় শুরু করেন নানান রকম ফলের চাষ।

শুরুতে তিনি লিচু, ড্রাগন, মার্লবেরি ও অ্যাভোকাডোর চাষ শুরু করেন। এরপর চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পেনিফোলিয়া জাতের ভ্যানিলার চারা কিনে আনেন। পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ১০ কাঠা জমিতে পিলার করে গ্রিনহাউস প্রক্রিয়ায় চাষ শুরু করেন। চার বছরে পুরো চাষ প্রক্রিয়ায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে সেই ভ্যানিলার গাছে প্রথমবারের মতো ফুল থেকে ফল এসেছে। চলতি বছরে তার বাগানের ভ্যানিলা বিক্রি করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছি। ২০২২ সালেই এই চারাগুলো আমি সংগ্রহ করি। ইউটিউবে এবং ভ্যানিলার প্রজেক্ট প্রোগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করি। প্রথমত পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে এই চারাগুলো দেখি ও রোপণের পদ্ধতি জেনে নিই। সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি চারাগুলো ২০২২ সালে লাগিয়েছি। এখন এই গাছগুলোতে ফুল ও ফল এসেছে। এই ফলগুলো এক থেকে দেড় মাস পরে উত্তোলন করা যাবে। ভ্যানিলার ভেতরে রং অনেকটা সুরমার রঙের মতো। চলতি মৌসুমে তার জমি থেকে প্রায় ১২০ কেজি ভ্যানিলা উৎপাদন হবে।”

জানা যায়, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ভ্যানিলা প্রকারভেদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদি বাজার ঠিক থাকে, তাহলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় ফলগুলো বিক্রি করা যাবে। ভ্যানিলা চাষে অনেক ধৈর্য লাগে। তার ভ্যানিলা বাগান পরিচর্যার জন্য দৈনিক চারজন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়াও অন্যান্য কাজে আরও ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়।

এটি খুব সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ করা হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এটি বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়। তবে গ্রিনহাউস করে ছায়াযুক্ত স্থানে এটি চাষ করা সম্ভব। ভ্যানিলা চাষের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে হয়।

হুমায়ুন কবীর ২০২২ সালে এক লাখ টাকা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৫০ মিটার ভ্যানিলা লতা নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো একটি করে গিঁট রেখে ছোট ছোট করে কেটে প্রায় হাজারখানেক চারার পাতো দেন। চার মাস পাতো দেওয়ার পর সেগুলো রোপণ করা হয়। এর আগে বেলে-দোঁআশ মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে মাটি তৈরি করেন। ভ্যানিলার পাতো সেই মাটিতে রোপণ করা হয়।

ভ্যানিলা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের ফসল হওয়ায় প্রতিনিয়ত এখানে পানি স্প্রে করতে হয়। ভ্যানিলা গাছ আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, এর লতা-পাতা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। ভ্যানিলা গাছ রোপণের ৪ থেকে ৫ বছর পর ফল দিতে শুরু করে। বছরে দুইবার ফল ধরে। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর সময়ে ফলের পরিমাণ বেশি থাকে। ফল তোলার পর এর ডগা কেটে পাতো দিতে হয়। আর এই পাতো জমিতে রোপণ করা যায়।

ভ্যানিলায় তেমন একটা রোগবালাই দেখা যায় না। তবে কিছু ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগে হালকা কিছু রোগবালাই হলে তা দমন করা যায়। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যেই ভ্যানিলা গাছে ফুল আসে। এরপর পরিচর্যা করলে খুব দ্রুতই ফুল থেকে ফলে রূপান্তরিত হয়। অক্টোবর মাসের মধ্যেই ফলগুলো পরিপক্ব হয়ে যায়।

গাছ থেকে ফল তোলার পর ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন মিনিট করে শেকিং বা সেদ্ধ করা হয়। এভাবে তিনবার শেকিং করা হয়। তারপর এই সেদ্ধ ফলগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়। প্রতি কেজি শুকনো ভ্যানিলা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেল ও বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো ভ্যানিলার ক্রেতা।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, “সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের কলোনিপাড়ায় হুমায়ুন কবীর ফরাজী নিজে উদ্যোগী হয়ে ১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছেন। চার বছর পরে এবার ফুল ও ফল এসেছে। আশা করি, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই উনি সব ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।”

তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আসলে যে টেকনোলজি আছে, এই টেকনোলজিগুলোর সম্পর্কে আরও যদি একটু আমরা জানতে পারি বা আমাদের গবেষকরা যদি এটি নিয়ে আরও একটু গবেষণা করে, ভবিষ্যতে ভ্যানিলা চাষ সম্প্রসারণ সম্ভব। যেহেতু ভ্যানিলা একটি অত্যন্ত উচ্চমূল্যের ফসল, এর সম্প্রসারণ ঘটাতে পারলে দেশের চাহিদা পূরণ করে দেশের বাইরেও রপ্তানি করা সম্ভব। রপ্তানি করলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। আবার বাইরে থেকে ভ্যানিলা আমদানির খরচও লাগবে না। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজে বেশ কিছু লোকের কর্মসংস্থানও হবে।”